kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিশিরাতে সরব সিসা লাউঞ্জ

উপাদান মাত্রা নিয়ে ধোঁয়াশা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিসা (বিশেষ হুঁকা) সেবন ও বিক্রি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিষিদ্ধ। তবে থেমে নেই নিষিদ্ধ এই দ্রব্যটির গোপন কারবার। এখনো সচল রাজধানীর দুই শতাধিক সিসা লাউঞ্জ বা বার। করোনার কারণে কিছু রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকলেও যেগুলো খোলা আছে, সেখানে চালু রয়েছে সিসা লাউঞ্জ। এসব রেস্টুরেন্টে রাতে বেশির ভাগ সময় জমজমাট থাকে সিসা সেবন। নতুন আইন অনযায়ী, ০.২ শতাংশের বেশি নিকোটিন এবং এসেন্স ক্যারামেল মিশ্রিত ফ্রুট স্লাইস সহযোগে তৈরি সিসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা ফ্রুট স্লাইসে এসেন্স ক্যারামেলের মাত্রা ৪ শতাংশের বেশি থাকে। এ উপাদান নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহারের ব্যবস্থা নেই। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ০.২ শতাংশের মধ্যে উপাদান রেখে বিক্রি করতে বলছেন। অনেকে এই অজুহাত দেখিয়ে সিসা লাউঞ্জ চালু রেখেছে। অন্যদিকে নতুন আইনের পর সিসাকে মাদক তালিকা এবং অভিযানের আওতা থেকে বাদ দিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করেছেন সিসা লাউঞ্জ কারবারিরা। এতে অভিযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া হলেও শিথিলতা দেখাচ্ছেন ডিএনসির কর্মকর্তারা।

ডিএনসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সিসা লাউঞ্জের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হবে। কোনো লাইসেন্সের মাধ্যমে এটি চালানো যাবে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর রয়েছে। এ আইনের তফসিলে সিসাকে ‘খ’ শ্রেণির মাদক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই তালিকার ৪ নম্বর ক্রমিকে ক্যাফেইনযুক্ত (০.১৪৫ শতাংশ) তরল পানীয়ের পরই সিসার নাম যুক্ত করা হয়। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের ভেষজের নির্যাসসহ ০.২ শতাংশের বেশি নিকোটিন এবং এসেন্স ক্যারামেল মিশ্রিত ফ্রুট স্লাইস সহযোগে তৈরি যেকোনো পদার্থই সিসা। আইন অনুযায়ী সিসা সেবন, বহন, বিক্রি, সরবরাহ করলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সিসা কারবার করলে এক থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। সিসায় ব্যবহৃত নিষিদ্ধ দ্রব্য উৎপাদক ও বিক্রির দখল, সংরক্ষণ ও গুদামজাত করা হলে এক কেজি বা লিটারের জন্য এক থেকে পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে। এক কেজি বা লিটার থেকে পাঁচ কেজি বা লিটার পর্যন্ত পাঁচ থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। পাঁচ কেজি বা লিটারের বেশি হলে সাত থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর বনানী, গুলশান, উত্তরা, বারিধারা, বাড্ডা, মিরপুর ও ধানমণ্ডি এলাকায় দুই শতাধিক সিসার লাউঞ্জ রয়েছে। আর এসব লাউঞ্জের বেশির ভাগ চলছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার আড়ালে। প্রথমে রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল, পরে সেটিকে বার হিসেবে চালুর লাইসেন্স নেওয়া হয়। এর আড়ালেই এত দিন ধরে চলছে সিসা বিক্রি। এসব লাউঞ্জে ইয়াবা সেবন এবং সিসার সঙ্গে অন্য মাদক গ্রহণেরও অভিযোগ মিলেছে। আধো আলোতে মদের বারের মতোই চলা সিসার রেস্টুরেন্ট তরুণ-তরুণীদের মাদকাসক্ত তৈরি করছে বলে দাবি করে আসছেন বিশ্লেষকরা। সিসা সেবনকারীদের আরাম-আয়েশের জন্য এসব বারে নরম গদি, তাকিয়া ও মখমলের গালিচা বিছানো থাকে। আর সিসা সেবনের মুহূর্তগুলোকে ‘রোমান্টিক’ করার জন্য হালকা ও রঙিন আলো-আঁধারির মধ্যে মৃদু স্নায়ু উত্তেজক সংগীত পরিবেশনের ব্যবস্থা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো বার, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে সিসার সঙ্গে গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবাও মেশানো হচ্ছে।

এসব কারণে আগেও সিসা বারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে ডিএনসি। তবে আইনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাড়াশি অভিযান না চালিয়ে বারগুলোকে প্রথমে সতর্ক করেন তাঁরা। এরপরই শুরু হয় লুকোচুরি। বারের মালিকদের অনেকে ক্রেতা বুঝে সিসা বিক্রি করছেন। চেনা মুখ ছাড়া তাঁরা কারো কাছে সিসা তুলে দিচ্ছেন না। এমনকি বারে অভিযান চালানো হবে—এ রকম আভাস পেলেই সিসার সব উপকরণ তাঁরা দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। দিনে বন্ধ রেখে রাতে খোলা রাখছেন। ব্যবসায়ীরা অভিযান বন্ধ চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিটও করেন। এমন এক পরিস্থিতিতে করোনা মহামারি শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় অনেক সিসা লাউঞ্জ। রেস্টুরেন্ট খুলতেই অনেকে ফের কারবার চালু করেছে।

সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা সিসার কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সিসা কারবার বন্ধে ওই প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএনসির ঢাকা মেট্রোর উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, সিসার লাউঞ্জে অভিযান হয়। তবে উপাদানের ব্যাপারে আইনে যে কথা আছে, সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। আবার কারবারিরা একটি রিটও করেছে। তবে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে উপাদান কম দেখিয়ে চালু রাখতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা