kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পরিত্যক্ত জীবাণুনাশক টানেল

স্যানিটাইজার নেই, বেসিন-কলও উধাও

জহিরুল ইসলাম ও শম্পা বিশ্বাস   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পরিত্যক্ত জীবাণুনাশক টানেল

করোনা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে নানা তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু খোদ হাসপাতালের জীবাণুনাশক টানেলের এই অবস্থা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বার্তাও দিচ্ছে। গতকাল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ছবি : লুৎফর রহমান

সরকারঘোষিত করোনাকালীন সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে গত জুনে অফিস ও মার্কেট খুলে দেওয়ার পর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং জীবাণুনাশক টানেল বসানোয়। তবে সেপ্টেম্বর থেকেই বহু স্থানে এই বাধ্যবাধকতা আর মানা হচ্ছে না। রাজধানীর দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, মার্কেটসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এখন আর নেই হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। পানির ট্যাংক ও বেসিনগুলো হয় উধাও, নয়তো নষ্ট। অনেক স্থানেই জীবাণুনাশক টানেল থাকলেও সেগুলো আর কাজ করছে না।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আজিমপুরে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকের পাশে এখন আর নেই কোনো ধরনের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। নজিবুর রহমান নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘এপ্রিল-মে মাসের দিকে অভ্যর্থনা ডেস্কের পাশে পানির ট্যাংক ও সাবান রাখা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আর দেখছি না।’

আজিমপুরে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানেও নেই হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা, নেই জীবাণুনাশক টানেলও। অফিসটিতে শিশু বিকাশ কেন্দ্র, দিবাকালীন শিশু যত্ন কেন্দ্র, ছোট মনি নিবাস ও শহর সমাজসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক মানুষের আসা-যাওয়া, তার পরও নেই করোনা থেকে রক্ষায় কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রকনুল হক বলেন, ‘অনেক কিছুই করা দরকার। হাত ধোয়া তো আমাদের সবার নিরাপত্তার জন্যই। এখানে প্রতিদিন ৫০০-এর বেশি মানুষ আসে। সবার জন্য যদি প্রতিদিন হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে যাই, তবে আমার বেতন কুলাবে না।’

পুরান ঢাকার হরনাথ ঘোষ রোড, উর্দু রোড, আবুল হাসনাত রোড, সাত রওজা, আরমানিটোলা, নয়াবাজার, জিন্দাবাহার, ইসলামবাগ, কোতোয়ালি রোড, নাখাল চন্দ্র বসাক লেন, সিক্কাটুলি, মেথরপট্টি, আগা সাদেক লেন, সদরঘাট, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিক্যালের সামনে, জাতীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কোথাও এখন আর হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংক ও বেসিন চোখে পড়েনি। ডিএসসিসি আঞ্চলিক অফিস-৩-এর নিচে গিয়ে পানির বেসিন দেখা গেলেও পাওয়া যায়নি হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (ডা.) মো. শরীফ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব ওয়ার্ডে পানির ট্যাংক বসিয়েছিলাম। বর্তমানে কিছু সচল আছে, কিছু অচল হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় আমরা সাবান বিতরণ করেছি। এখন না থাকলে বিষয়টি কাউন্সিলররা ভালো বলতে পারবেন।’

করোনার শুরুতে দুই সিটির বেশ কিছু ওয়ার্ডে সাত-আটটি করে পানির ট্যাংক বসানো হয়েছিল। ডিএসসিসি ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোকাদ্দেস হোসেন জাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যা বসানো হয়েছিল এর মধ্যে ৫০ শতাংশ আছে। আমার ওয়ার্ডে সাতটা বসানো হয়েছিল। এখনো কয়েকটা আছে।’

দক্ষিণের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক বলেন. ‘আমার ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশন থেকে হাত ধোয়ার জন্য কিছুই পাইনি, তাই নাই।’

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। গতকাল দুপুরে গেট পেরিয়ে মূল ভবনে প্রবেশের মুখে জীবাণুনাশক টানেল চোখে পড়লেও সেটি পড়ে রয়েছে অকেজো অবস্থায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর কিছুদিন টানেলটি সচল থাকার পর নষ্ট হয়ে যায়। এরপর এটি আর সংস্কার করা হয়নি। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসে এই হাসপাতালে। সঙ্গে আসে স্বজন। দায়িত্ব পালন করছেন ডাক্তার-নার্সসহ অন্য কর্মীরা, কিন্তু এই হাসপাতালে স্থাপন করা জীবাণুনাশক টানেলটি আর সংস্কার হয়নি। অন্যদিকে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন থাকলেও কাউকে তা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।

আবার রাজধানীর গুলশান-১-এ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (দক্ষিণ) ডিএনসিসি পাকা মার্কেট। গতকাল দুপুরের পর ওই মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে জীবাণুনাশক টানেলই নেই। তবে মার্কেটে প্রবেশ করলে হাতের ডান পাশ দিয়ে কিছুটা এগোলে দেখা গেল পাঁচটি হাত ধোয়ার বেসিন। সব নষ্ট। সেখানে ময়লায় ঠাসা।

বিষয়টি নিয়ে ওই মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন পানি দিচ্ছে না, ফলে ট্যাপগুলো বন্ধ। তারা পানি দিলে আমরা আবার চালু করব। আমরা নিজেরা পান করতে কিংবা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য বোতলে করে পানি নিয়ে আসি কিংবা কিনে নিই।’

কবে নাগাদ ট্যাপগুলো চালু হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

গুলশান-২-এ ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশনের ভবন। ওই ভবনে প্রবেশে কড়াকড়ি রয়েছে। তবে গেট দিয়ে ভেতরে তাকাতে হাতের বাঁ পাশে চোখে পড়ল একটি জীবাণুনাশক টানেল। সেটিও অকেজো। টানেলটির সঙ্গে পানি কিংবা স্প্রের সংযোগ দেখা যায়নি। আর অনুমতি নিয়ে যারা ওই ভবনে প্রবেশ করছিল, তাদের কাউকে ওই জীবাণুনাশক টানেলের মধ্য দিয়ে যেতেও দেখা যায়নি। গেটে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী সাংবাদিক পরিচয় জানতেই গেট আটকে দিয়ে বলেন, এখানে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র আছে। জীবাণুনাশক টানেল সম্পর্কে তিনি সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

এই ভবনের কিছুটা উত্তরে গুলশান থানা। থানার সামনে রয়েছে একটি জীবাণুনাশক টানেল। তবে অকেজো। একইভাবে মিরপুর মডেল থানায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই থানার সামনেও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে একটি জীবাণুনাশক টানেল। বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মিরপুর মডেল থানার ওসি মোস্তাজিরুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখন করোনার প্রথম ঢেউ ছিল, তখন এটা চালু ছিল। দ্বিতীয় ঢেউ এলে আবার চালু করা হবে। সারাক্ষণ তো আর চালিয়ে রাখা যায় না! করোনার প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়ায় এটা বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও আমার মনে হয়, করোনা রোধে জীবাণুনাশক টানেল কাজে আসে না।’

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানকে জীবাণুনাশক টানেল এবং হাত ধোয়ার ট্যাপ স্থাপন করে দিয়েছি, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় এসব নাই হয়ে যাচ্ছে। তার পরও আমরা আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করছি।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা যেখানে যেখানে এই জিনিসগুলো স্থাপন করছি, সেখানকার মানুষদেরও সচেতন হতে হবে, আমাদের সহায়তা করতে হবে।’

গুলশান-১-এ ডিএনসিসি পাকা মার্কেটে পানি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘পানি সরবরাহের কাজ ওয়াসার, সিটি করপোরেশনের নয়। তার পরও আমরা বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা