kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মিছিল স্লোগানে নাই তবু কমিটিতে ঠাঁই

পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেল বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাহুল গাজী। আওয়ামী লীগের মিছিলে কেউ কোনো দিন তাঁকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখেনি। ছিলেন না কোনো কর্মসূচিতেও। তার পরও তিনি আওয়ামী লীগের বগুড়া জেলা কমিটির সদস্য বনে গেছেন। কমিটিতে সদস্য পদ বাগিয়ে নেওয়া তৌহিদুর রহমান বাপ্পীর গল্পটাও একই। মিজানুর রহমান রতন হয়েছেন সহসভাপতি। কমিটিতে এত বড় পদ তাঁর নামের সঙ্গে দেখে স্থানীয় অনেক নেতার কপালে ভাঁজ পড়েছে। কারণ একটাই, দলীয় কোনো কর্মসূচিতে তাঁদের ছায়াও কখনো দেখেনি কেউ।

১১ মাস পর গত সোমবার বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতাদের অবয়ব দেখে ত্যাগী নেতাকর্মীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। নানা ফিকির করে ওই কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন শ্মশান দখলকারী থেকে শুরু করে হত্যা মামলার আসামিও। কয়েকজন নারী নেত্রী মাঠে ঘাম ঝরালেও বঞ্চিত করা হয়েছে তাঁদের। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় নেতারা কমিটি গঠনে দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মানেননি।

বগুড়া আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর। সম্মেলনের ১১ মাস পর গত সোমবার ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এতে ৩৯টি কার্যকরী পদের মধ্যে তিনটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। ৩২ জনকে রাখা হয়েছে সদস্য পদে। ঘোষিত ৭১ সদস্যের কমিটিতে আগের কমিটির ৪১ জনকে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩০ জনকে রাখা হয়েছে একই পদে। তবে তিনজনকে আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। নতুন কমিটিতে সদস্য পদে নতুন দুজনসহ তিন নারীকে স্থান দেওয়া হয়েছে।

তবে কমিটি গঠনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পূর্বনির্দেশনা মানা হয়নি। কারণ তিনি বলেছিলেন, এক নেতা একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এই কমিটির অনেক নেতা উপজেলা ও জেলা কমিটিতেও রয়েছেন।

এদিকে নেতৃত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি কী? কমিটি ঘোষণার পর এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুলতান মাহমুদ খান রনি। তিনি আগের কমিটিতেও একই পদে ছিলেন। ভাইরাল হওয়া এই স্ট্যাটাসে জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অনেকেই। সেখানে বলা হয়েছে, জেলা সভাপতি মজিবর রহমান মজুর আস্থাভাজন হওয়ায় অযোগ্য অনেকেই পদ বাগিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে ত্যাগী নেতাদের।

জানা গেছে, নতুন কমিটির সহসভাপতি মিজানুর রহমান রতন কখনো দলীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন না। তিনি হঠাৎ করেই ‘আকাশের চাঁদ’ পেয়ে গেছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিয়ার আরিফ ওপেল দলে সক্রিয় নন। এমন অভিযোগ করেছেন প্রচার সম্পাদক সুলতান মাহমুদ নিজেই। তার পরও সভাপতি মজিবর রহমানের কাছের লোক হওয়ার কারণে ওপেল হয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলুর আস্থাভাজন হওয়ায় নিয়ম ভেঙে সদস্য পদ পেয়েছেন তাঁর ভাগ্নে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল্লা আল ফারুক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আলমগীর হোসেন স্বপন। শ্মশান দখলকারী হিসেবে উচ্চ আদালত থেকে তিরস্কার পাওয়া নেতা শিবগঞ্জের আজিজুল হক, হত্যা মামলার আসামি আদমদীঘির আশরাফুল ইসলাম মন্টু, ‘হাইব্রিড নেতা’ সাইদ ফকির রাতারাতি জেলা আওয়ামী লীগের পদ বাগিয়েছেন।

ছাত্রলীগের জেলা কমিটির ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদিকা রুমানা আজিজ রিংকি জেলা যুবলীগের প্রস্তাবিত কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন। তিনি আবার নতুন কমিটির নির্বাহী সদস্য পদও পেয়েছেন। রুমানা আজিজ রিংকি ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কোনো কমিটি থেকেই পদত্যাগ করেননি।

দুপচাঁচিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরিন রূপা সদস্য পদ পেলেও দীর্ঘদিন থেকে বগুড়ায় মহিলা আওয়ামী লীগে সক্রিয় অনেকেই পদ পাননি। এমনকি সাবেক সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ খাদিজা খাতুন শেফালী কমিটিতে ঠাঁই পাননি। কাহালুর ‘হঠাৎ নেতা’ অধ্যক্ষ আহসানুল হক কখনো ছাত্রলীগ- যুবলীগে সক্রিয় নেতা না হলেও জেলা কমিটির সদস্য হয়েছেন।

গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি পদে মজিবর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে রাগেবুল আহসানের নাম ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া টি জামান নিকেতাকে সহসভাপতি, মঞ্জুরুল আলম মোহন, সাগর কুমার রায় ও এ কে এম আসাদুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক এবং প্রয়াত সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের ছেলে ও ব্যবসায়ী নেতা মাসুদুর রহমানকে অর্থ সম্পাদক করা হয়। পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম প্রস্তাব নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঐকমত্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হন। দুই নেতা তাঁদের পছন্দমতো আলাদা নাম প্রস্তাব করেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে। সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল গঠন করা হয়।

ঘোষিত কমিটিতে মকবুল হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, টি এম মুসা, আবদুল মতিন, আবুল কালাম আজাদ, মকবুল হোসেন মুকুল, রেজাউল করিম ও আমানুল্লাহ এবারও সহসভাপতি পদ পেয়েছেন। সহসভাপতি পদে নতুন দুজনের মধ্যে প্রদীপ কুমার রায় আগে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

বগুড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এ কে এম আসাদুর রহমান বলেন, জেলা কমিটিতে কোনো উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকতে পারবেন না বলে দলীয় প্রধান নির্দেশনা দিয়েছেন। তার পরও ঘোষিত কমিটিতে কয়েকজনের নাম ভুলবশত এসেছে। দু-এক দিনের মধ্যে কমিটি আরেক দফা সংশোধন হতে পারে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে অসন্তোষ এবং অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, আমি সেই কমিটির সদস্যদের নিয়েই কাজ করতে প্রস্তুত আছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা