kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

লেভি আদায় নিয়ে প্রশ্ন

বারভিডায় বিভক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বারভিডায় বিভক্তি

রিকন্ডিশন্ড বা একবার ব্যবহৃত গাড়ি বন্দর থেকে ছাড়ের আগে এক হাজার টাকা লেভি বা চাঁদা আদায় শুরু করেছে গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডা। বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন বা বারভিডার পক্ষে এই লেভি আদায় শুরু করেছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে ১০০ টাকা নিজেদের জন্য রেখে বাকি ৯০০ টাকা বারভিডা তহবিলে জমা করবে মোংলা বন্দর। কিন্তু বেসরকারি সংগঠনের চাঁদা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদায়ের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমনিতেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে বারভিডায় বিভক্তি রয়েছে; এর মধ্যে ‘লেভি’ আদায় নিয়ে কোন্দল প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে কয়েকজন বারভিডা সদস্য এই লেভি আদায়ের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী চাঁদা আদায়কে অবৈধ অভিহিত করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশও দিয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি কোনো সংগঠনের চাঁদা বন্দরের মাধ্যমে আদায়ের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়; এতে হস্তক্ষেপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহনসচিব এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

লিখিত অভিযোগকারী বারভিডা সদস্য মেসার্স কে কে করপোরেশনের মালিক দীনুল ইসলাম গত ১৭ নভেম্বর ‘লেভির’ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছর আমি সংগঠনের সদস্য পদের জন্য নির্ধারিত চাঁদা দিচ্ছি। আর গাড়ি আমদানিতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব ফি দিচ্ছি। তাহলে গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত এক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে কোন যুক্তিতে?’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারভিডার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, ‘করোনার কারণে এমনিতেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা লাটে উঠেছে। সংগঠনের নেতাদের মধ্যে বহিষ্কার-দুর্নীতি-অনিয়ম; সংগঠনের তহবিল তছরুফের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বারভিডার লেভি আদায়ের সিদ্ধান্তে বিভক্তি আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।’

বারভিডার ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা গাড়িগুলো থেকে এক হাজার টাকা লেভি আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, বারভিডার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে তহবিল বাড়াতে এ লেভি আদায় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বারভিডার সভাপতি আবদুল হক ও মহাসচিব মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম চিঠি দিয়ে প্রতি ইউনিট গাড়ির ওপর লেভি বাবদ ধার্য করা অর্থ প্রদানের বিষয়ে নিজ নিজ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। এরপর গত ৫ নভেম্বর থেকে মোংলা বন্দরে এই লেভি আদায় কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় বিভিন্ন গাড়ি আমদানিকারক ও গাড়ি ডিলারের আপত্তি।

জানতে চাইলে বারভিডা সভাপতি আবদুল হক বলছেন, “সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ‘বারভিডা লেভি’ আদায়ের সিদ্ধান্ত হয়। করোনার কারণে আমরা এত দিন সেটি কার্যকর করতে পারিনি। এখন শুধু আমাদের সদস্যদের কাছ থেকে এই লেভি আদায় করা হচ্ছে। আমরা যে লেভি আদায় করছি, সেটি নিয়ম মেনেই করছি; পেছানোর সুযোগ নেই।” বারভিডার বহিষ্কৃত এক নেতার ইন্ধনে এসব অবান্তর অভিযোগ তোলা হচ্ছে; যেটার জবাব আইনিভাবেই দেওয়া হবে—যোগ করেন তিনি।

এদিকে বেসরকারি সংগঠনের চাঁদা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদায় সংবিধানবহির্ভূত উল্লেখ করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আমান উল্লাহ। তিনি বলছেন, পোর্ট অ্যাক্ট ১৯০৮ এবং মোংলা পোর্ট অর্ডিনেন্স ১৯৭৬ অনুযায়ী সরকারি সংস্থা বেসরকারি সংস্থার পক্ষ হয়ে আলাদা কোনো শুল্ক বা লেভি আদায় করতে পারে না। এ ছাড়া বার্ষিক সাধারণ সভা কিংবা ইসি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত কতগুলো চুক্তি। আইন অনুযায়ী অবৈধ চুক্তি কোনো চুক্তি হয় না। তাই ‘বারভিডা লেভি’ নামে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা আদায় করা সম্পূর্ণ বেআইনি। আর বারভিডাকে এই ধরনের সুবিধা দেওয়া মানে বৈষম্য সৃষ্টি করা। কারণ বন্দরের অন্যান্য স্টেকহোল্ডারও এমন চার্জ আদায়ের আবদার করে বসতে পারে।

বেসরকারি সংগঠনের চাঁদা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি এমন নয়। বারভিডা আমাদের বড় স্টেকহোল্ডার। তাদের সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে লেভি আদায় করছে; এতে আমাদের বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রথমদিকে আমরা নিজেরা কাজটি করেছিলাম; পরে তাদের চাঁদা বারভিডা নিজেরাই আদায় করছে। আদায়ের স্লিপ কপি দেখলেই বোঝা যাবে। আর বন্দরের ভেতর সার্ভিস প্রভাইডার হিসেবে শুধু তাদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নিচ্ছি।’ তিনি বলছেন, ‘নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয় আমাদের ওপর চাপাতে চাইছে।’

এদিকে লেভি আদায়ের জন্য একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে আবেদন করলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো সাড়া দেয়নি। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, লেভি আদায়ের জন্য বারভিডা আবেদন করেনি। বন্দরের বাইরে নতুন কারশেডের সামনে একটি স্থান চেয়েছে; যেখানে তাদের নিজেদের কাজ করবে। এখনো সেটি অনুমোদন মেলেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা