kalerkantho

বুধবার । ১৩ মাঘ ১৪২৭। ২৭ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শপিং মল কিংবা কর্মস্থল জায়গা নেই কোথাও

ঘরের বাইরে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না মায়েরা

শম্পা বিশ্বাস   

১৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শপিং মল কিংবা কর্মস্থল জায়গা নেই কোথাও

ছয় মাসের শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন দিলরুবা নাহিদ। কিছুক্ষণ পর শিশুটি কান্না জুড়ে দিলে ক্ষুধা পেয়েছে বুঝতে পেরে তিনি সন্তানকে নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে চলে যান। গাড়িতে বসে শিশুটিকে বুকের দুধ খাইয়ে আবার মার্কেটে ফিরে বাকি কেনাকাটা শেষ করেন।

কথা প্রসঙ্গে দিলরুবা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীর শপিং মলগুলোয় শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর কোনো স্থান নেই। দুই-একজন দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা এমন ভঙ্গি করলেন, যেন আমি খারাপ কিছু বলে ফেলেছি। এটি খুব অমানবিক।’ 

রামপুরা এলাকার গৃহিণী নিতু আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে গেলে সঙ্গে দুধের ফিডার নিয়ে যেতে হয়। এটি বাচ্চার শরীরের জন্য মোটেও ভালো নয়। কিন্তু বাইরে কোথাও বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে বাজারের কেনা দুধ

খাওয়াতে হয়।’

বর্তমানে সন্তান বড় হয়ে গেলেও বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ও সংবাদ পাঠিকা মাহমুদা মৌমিতা যখন তাঁর সন্তান ছোট ছিল তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে বিচিত্র সমস্যা মোকাবেলা করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্তানকে ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। কিন্তু কর্মজীবী নারী হওয়ায় পাঁচ মাস বয়স থেকে আমার বাচ্চাকে খিচুড়ি বা বাড়তি খাবার দিতে হয়েছে। যে সময়টায় আমি অফিস করতাম, ওই সময়টায় বাচ্চাকে খাওয়াতে বাজারের বিকল্প দুধের ওপর নির্ভর করতে হতো। কারণ তখন আমার কর্মস্থলে কোনো ব্রেস্ট ফিডিং বা বেবিকেয়ার কর্নার ছিল না। বর্তমানে অবশ্য আমার কর্মস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার তৈরি করা হয়েছে।’

দিলরুবা নাহিদ, নিতু আক্তার, মাহমুদা মৌমিতার মতো হাজারো মাকে কর্মস্থলসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত খাদিজাতুল কোবরা বলেন, ‘আমার বাচ্চার জন্মের পর ওর পেটে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তখন ওকে নিয়ে আমাকে নিয়মিত হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যেতে হতো। বাচ্চা যেহেতু খুব ছোট ছিল, তাই ঘন ঘন ওকে বুকের দুধ দিতে হতো। কিন্তু পুরো হাসপাতাল ঘুরে কোথাও আমি ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার পাইনি।’

রাজধানীর অনেক শপিং মলে ধূমপানের জন্য কর্নার থাকলেও শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর কোনো জায়গা নেই। ফলে প্রতিনিয়ত মায়েদের তাঁর শিশুসন্তানকে নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত বছর ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এবং তাঁর শিশুসন্তান উমাইর বিন সাদীর পক্ষে বাবা শেখ সাদী রহমান ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবিকেয়ার কর্নারের জন্য আদালতে রিট করেন। ওই রিটের পক্ষে ওই বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। রুলে কর্মস্থল, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, এয়ারপোর্ট, শপিং মলের মতো ব্যাপক জনসমাগমস্থলে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেন ব্রেস্ট ফিডিং ও বেবিকেয়ার কর্নার স্থাপনে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ওই রিটের সম্পূরক এক আবেদন শুনানি শেষে গার্মেন্টসহ দেশের সব কল-কারখানায় দুই মাসের মধ্যে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে ৬০ দিনের মধ্যে শ্রমসচিব ও শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু এরপর পার হয়েছে আট মাস। বাস্তবে কোথাও এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়নি।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার জানা মতে রাজধানীর কোনো গার্মেন্ট কারখানায় বেবিকেয়ার কর্নার নেই। আন্দোলন ছাড়া গার্মেন্টগুলোয় কোনো দাবি আদায় হয় না। আন্দোলন করলে এটাও মিলবে।’

অবশ্য মোহাম্মদী গ্রুপের মালিকানাধীন গার্মেন্টগুলোয় এরই মধ্যে বেবিকেয়ার কর্নার স্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।

গার্মেন্টসহ দেশের সব কল-কারখানায় দুই মাসের মধ্যে বেবিকেয়ার কর্নার স্থাপনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে গার্মেন্টসহ দেশের সব কল-কারখানায় চিঠি দিয়েছি ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করতে। এত দিনেও কেন তারা তা বাস্তবায়ন করেনি দ্রুত খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রুল জারির পর রেলওয়ে স্টেশন, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসসহ সরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। আরো অনেক জায়গায় কাজ চলছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে সরকারিভাবে তদারকি করতে হবে। রিট করা নিয়ে আমাকে নানা উপহাস শুনতে হয়েছে। যত দিন পর্যন্ত মায়েরা তাদের শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে সুনির্দিষ্ট এবং নিরাপদ জায়গা না পান তত দিন পর্যন্ত আমি লড়াই করে যাব।’

দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের কাজ করছে বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ফাইন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. এস কে রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করেছি। আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ চলছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তাদের অধীনে যত প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোয় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে সব ধরনের টেকনিক্যাল সহায়তা দিব আমরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা