kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

নির্যাতনে শিশু মরিয়মের মৃত্যু

ছেলের কথায় কান না দিয়ে মেয়ে হারালেন!

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মাস ছয়েক আগে শিশু মরিয়মের বড় ভাই রবিউলকেও (১০) কাজে নিয়েছিলেন নাদরাতুল নাইম আহমেদ ও এনাম এলাহী শুভ দম্পতি। তাঁদের নির্যাতন সইতে না পেরে সপ্তাহখানেক পরেই পালিয়ে বাড়িতে আসে সে। তবে তার কথা কেউ কানে তোলেনি। উল্টো শিশুটির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দুষ্টুমির অভিযোগ করেন নাদরাতুল। এ অবস্থায় প্রতিবেশী নাদরাতুলের চাপাচাপি এবং নিজেদের অভাব-অনটনের কথা ভেবে দুই মাস আগে আট বছরের ছোট্ট মেয়ে মরিয়মকে কাজে পাঠান সিরাজুল ইসলাম ও কুলসুম বেগম। সেই মেয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে। ছেলের কথায় এখন অঝোরে কাঁদছেন সন্তানহারা দরিদ্র এই মা-বাবা। কোনো কিছুতেই সান্ত্বনা পাচ্ছেন না তাঁরা।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের ভুলিরপাড় গ্রাম থেকে গত বুধবার ভোরে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার বীর পাইকসা গ্রামে মরিয়মের লাশ নিয়ে আসেন নাদরাতুল (২২) ও এনাম। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে দাফন করা হয়েছে। এই গ্রামের মেয়ে নাদরাতুলের বিয়ে হয়েছে কুমিল্লার এনামের সঙ্গে।

গতকাল দুপুরে বীর পাইকসা গ্রামে মরিয়মদের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় শিশু রবিউলের সঙ্গে। তাকে করা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে সে বলে, ‘আমারে খাওন দিত না। খাওনের আগে দুই বোতল ফানি খাইয়াইত, যাতে ভাত কম লাগে। আমাকে মশার কয়েল দিয়া ছ্যাঁকা দিত। কথায় কথায় মারত। এর ফরে ফলাইয়া বাড়িত আইয়া ফরি। কিন্তু আমার কথা কেউ বিশ্বাস করল না। মরিয়মকে নেওনের সময়ও আমি না করছিলাম। আমার বইন হেরার কতায় হেই বাসায় যায়। অহন আমার কতা সবাই বিশ্বাস করতাছে।’

রবিউলের কথা শুনে তার শয্যাশায়ী মা কুলসুম বেগম বিলাপ করে ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলতে থাকেন, ‘ফুতের কতায় যদি বিশ্বাস করতাম, তাইলে এ সর্বনাশ আমার অইত না।’ কুলসুম বেগম জানান, প্রতিবেশী নাদরাতুল ভালো বংশের মেয়ে। তিনি বাড়ি এসে আবার মেয়েকে নেওয়ার জন্য তাঁকে ধরেন। অভাব-অনটনের কথা চিন্তা করে ছেলের কথা ভুলে মেয়েকে তাঁর হাতে তুলে দেন।

মরিয়মের বাবা অটোরিকশাচালক সিরাজুল বলেন, ‘মেয়ের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। ওর মায়ের সঙ্গে ১০-১৫ দিন আগে কথা হয়েছিল। তখন সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলেছিল, ভালো আছে। মা ভেবেছিল, বাড়ির জন্য মন খারাপ করে হয়তো মেয়ে কাঁদছে।’ এলাকাবাসী জানায়, সিরাজুল তিন ছেলে ও দুই মেয়েসহ পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে পারতেন না। তাই এক মেয়েকে ওই বাসায় পাঠিয়েছিলেন।

বাড়ির সামনেই কবর দেওয়া হয়েছে মরিয়মকে। পাশে বসে চোখের জল ফেলছেন মা-বাবা। কাঁদছে ভাই-বোনেরা। প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এ ঘটনায় গতকাল নিহত মরিয়মের বাবা সিরাজুল ওই দম্পতির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি হোসেনপুর থানার সহযোগিতায় কুমিল্লার দাউদকান্দি মডেল থানায় করা হয়েছে। কিভাবে কুমিল্লায় গিয়ে মামলা চালাবেন—মেয়ের মৃত্যুর শোকের মধ্যেও এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দরিদ্র সিরাজুল।

হোসেনপুর থানার ওসি শেখ মুস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাথমিক তদন্তে তাঁরা ধারণা করছেন, শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে। আটক দুুই আসামি নাদরাতুল ও এনামকে দাউদকান্দি থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মরিয়মের মরদেহ নিয়ে আসার পর তাঁদের আটক করে পুলিশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা