kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জীবনানন্দ দাশের ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সর্বানন্দ ভবন, ধানসিঁড়ি হয়ে জীবনানন্দ অঙ্গন

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সর্বানন্দ ভবন, ধানসিঁড়ি হয়ে জীবনানন্দ অঙ্গন

বরিশালকে বলা হয় কবি জীবনানন্দ দাশের স্বপ্নের শহর। এ শহরের আধা গ্রামীণ আধা শহরের পরিবেশে কবির জন্ম, শৈশব ও যৌবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। মূলত ১৯৪৬ সালে ব্রজমোহন কলেজ (বিএম) থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিল এই শহর। তাঁর চিঠিপত্র আসত ‘জীবনানন্দ দাশ, সর্বানন্দ ভবন, বরিশাল’ এই ঠিকানায়। সেই সর্বানন্দ ভবন থেকে কালের আবর্তে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন ধরে জেগে থাকে ‘ধানসিঁড়ি’, যা এখন মিলেছে ‘জীবনানন্দ অঙ্গনে’। 

বগুড়া সড়ক নামে পরিচিত সড়কটি ছিল অ্যাংলিকান চার্চ অক্সফোর্ড মিশনের গা ঘেঁষে শীতলাখোলা হয়ে বিএম কলেজ পর্যন্ত। এ সড়কটি যেখানে গোরস্তান সড়ক ও শীতলাখোলার মোহনায় পরিণত হয়েছে, সেখানেই ছিল জীবনানন্দ দাশের বাড়ি ‘সর্বানন্দ ভবন’। সর্বানন্দ দাশ ছিলেন জীবনানন্দ দাশের ঠাকুরদা। তিনি বরিশাল কালেকটরেটের কর্মচারী ছিলেন।

তবে সর্বানন্দ দাশ ওই বাড়িটি নির্মাণ করেননি। ধারণা করা হয়, দাশ পরিবার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। এমনকি জীবনানন্দ দাশের জন্মও ওই বাড়িতে নয়। অশ্বিনী দত্তের বাড়ির উল্টোদিকে কোনো এক বাড়িতে তাঁর জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি; তবে কোন বাড়ি তা আর চিহ্নিত করা যায়নি। কারণ পুরো এলাকার ভুগোলই পাল্টে গেছে।

ইতিহাস ও জীবনানন্দ গবেষকদের বরাতে যতটুকু জানা যায়, আর দশটি বাড়ির মতো গাছপালায় ঢাকা ছিল সর্বানন্দ ভবন। মূল বাড়ির পেছনে ছিল মাঝারি আকৃতির পুকুর। পুকুরের চারপাশ ঘিরে ছিল বিভিন্ন ধরনের ফলদ বৃক্ষের সমাহার। নারকেল, সুপারি, আম-জাম থেকে আনারস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একান্নবর্তী পরিবারের বিশালতা বাড়িটিকে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর রাখত।

তবে এখন আর সেই বাড়ি নেই। সর্বানন্দ ভবন এখন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। মূল বাড়িটির বাম পাশে অর্থাৎ শীতলাখোলার দিকের সামনের অংশটুকুতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। ডান পাশে অর্থাৎ মুসলিম গোরস্তান সড়কের মুখে গড়ে উঠেছে ওই একই দপ্তরের গুদাম ও কলোনি। মাঝখানের অংশটুকু এখন আবাসিক বাড়ি। তবে মূল বাড়িটি যেখানে ছিল, সেখানে ‘ধানসিঁড়ি’ নাম ধারণ করে একটি বসতবাড়ি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। যাঁরা জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তি জীবন ও পরিবার সম্পর্কে জানেন না, তাঁরা ধারণা করেন ‘ধানসিঁড়ি’ কবির বাড়ির প্রকৃত নাম। এর কারণ তাঁর কবিতায় ‘ধানসিঁড়ি’ শব্দটির বহুল ব্যবহার।

বাড়ির যে অংশে এখন গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে, সেই অংশে ছিল সর্বানন্দ ভবনের একটি সমাধিক্ষেত্র। সমাধিক্ষেত্রটি অত্যন্ত সুন্দর ছিল। লম্বা কংক্রিটের বেদির ওপর মৃত ব্যক্তিদের জীবাশ্ম এনে ছোট ছোট মঠ তৈরি করা হয়েছিল। চারদিকে ছিল সুশোভিত ফুলের বাগান। জীবনানন্দ দাশ যতক্ষণ বাড়িতে থাকতেন, তাঁর একটি লম্বা সময় তিনি এখানে কাটাতেন।

এ সমাধিক্ষেত্রের পেছনে ছিল কবির ঘর। ভূমি থেকে আড়াই-তিন ফুট দেয়াল, তার ওপরে মূলি বাঁশের বেড়া। গোলপাতায় ছাওয়া ঘরের চাল। এখানে একটি শোবার ঘর, বাথরুম, সামনে বারান্দা এবং পূর্ব দিকে ছোট আরেকটি বারান্দা ছিল। বড় বারান্দায় কবি সকাল-বিকেল পায়চারি করতেন।

ধানসিঁড়ি নামের বাড়িটির পাশে জেলা পরিষদের অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছে ‘জীবনানন্দ অঙ্গন’, যেখানে একটি অডিটরিয়াম ও জীবনানন্দের ম্যুরাল রয়েছে।

জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৬ সালের ৮ জুলাই থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএম কলেজের অধ্যাপনা থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতা যান। এরপর আর তিনি এ দেশে আসেননি। দেশ বিভাগের পর দাশ পরিবার কলকাতায় চলে যায়।

এরপর কালীশ চন্দ্র রোড়ের আইনজীবী পবিত্র কুমার ঘোষকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করা হয়। সেই দলিলপত্রে দেখা যায় ১৯৫৫ সালের ৩০ মে এটি কলকাতায় সম্পন্ন হয়। তত দিনে জীবনানন্দ দাশ মারা গেছেন। ফলে তিনি ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে স্বাক্ষর করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালের ১৭ জুন বরিশালের কারেকটরেট কর্মচারী আব্দুর রাজ্জাক মূল বাড়িটি কেনেন। ১৯৫৮-৫৯ সালে এই জমি হুকুম দখল হয়। হুকুম দখল রদের চেষ্টা করলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে সেখানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কলোনি, গুদাম ও পানির পাম্প বসানো হয়।

১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যান জীবনানন্দ দাশ। আজ তাঁর ৬৬তম মৃত্যুবার্ষিকী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা