kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

একদিন সাইনবোর্ডও লাপাত্তা হয়, বেদখল হয় খাসজমি-বাড়ি

অনেকে হয়তো জানবেই না যে জমিটি একসময় সরকারের মালিকানায় ছিল

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একদিন সাইনবোর্ডও লাপাত্তা হয়, বেদখল হয় খাসজমি-বাড়ি

ময়মনসিংহ নগরীর আমলাপাড়ায় একটি মূল্যবান জমিতে বছর তিনেক আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সাইনবোর্ড ছিল। সেই সাইনবোর্ডে জমির মালিকানা, পরিমাণ, দাগ নম্বর ও লিজগ্রহীতার নাম-পরিচয় উল্লেখ ছিল। সময়ের ব্যবধানে সেই জমিতে এখন উঁচু সীমানাপ্রাচীর। ভেতরের সাইনবোর্ডটিও নেই। নানা নাটকীয় ঘটনা সত্ত্বেও লিজগ্রহীতার মাধ্যমে জমিটি এখনো সরকারের মালিকানাধীন। তবে সচেতন নাগরিকদের ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে এখানে হুট করে ব্যক্তিমালিকানায় হয়তো বহুতল ভবন গড়ে উঠবে। তখন অনেকে হয়তো জানবেই না যে জমিটি একসময় সরকারের মালিকানায় ছিল। 

শুধু এই জমি নয়, ময়মনসিংহ নগরীতে বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি আছে। আছে মার্কেট ও বাসাবাড়ি। এসব জমি কোথাও অব্যবহৃত, কোথাও পরিত্যক্ত। আবার অনেক মার্কেট বা ভবন ভাড়া দেওয়া। কিন্তু এসব জমি কিংবা স্থাপনার ৯০ শতাংশই সরকারি জমি হিসেবে প্রকাশ্যে চিহ্নিত নয়। চিহ্নিত না থাকায় এসব জমির মালিকানা কার, ভোগদখলকারী কারা, জমির শ্রেণি কী, মামলা রয়েছে কি না, বেদখল হয়েছে কি না, তা জানা-বোঝার উপায় নেই।

শহরবাসীর ধারণা, সরকারি জমিগুলোর তথ্য প্রকাশ্যে দৃশ্যমান থাকলে তা বেদখলে বাধার সৃষ্টি করত। কখনো বেদখল হলে স্থানীয় লোকজন সেই তথ্য প্রশাসনকে জানাতে পারত। জালিয়াতি করে বিক্রি বা হাতবদল কঠিন হতো। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যেকোনো সময় যেকোনো কর্মকর্তা এসব জমির বিষয়ে সরেজমিনে নজরদারি করতে পারতেন।

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ৬৬টি দোকানঘর আছে, যা অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত। আর বাসা রয়েছে ২৫৫টি। এগুলোর বেশির ভাগই ময়মনসিংহ নগরীতে। আর নগরীতে কী পরিমাণ খাসজমি আছে, তা তাত্ক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি রাজস্ব শাখা। মামলার তথ্যও জানাতে পারেনি। তবে বাসা আর দোকানঘরের বাইরেও এই নগরীতে বিপুল পরিমাণ খাসজমি আছে। আছে সরকারি জলাশয়। নগরীর কোথায় এগুলোর অবস্থান, কারা এসব সম্পত্তি ভোগদখল করছে, জমি সরকারের দখলে আদৌ আছে, নাকি বেদখল হয়ে গেছে সহজভাবে তার চিত্র পাওয়া কঠিন। এসব জমি কিংবা স্থাপনায় কোনো সাইনবোর্ড নেই। সরকারি দপ্তরেও প্রকাশ্যে টাঙানো নেই জমির অবস্থান এবং বর্তমান মালিকদের কোনো তথ্য।

জানা গেছে, নগরীর সি কে ঘোষ রোড, শ্যামাচরণ রায় রোড, বড় বাজার, ছোট বাজার, গাঙিনার পাড়, গোলপুকুর পাড় এলাকায় সরকারের মালিকানাধীন দোকান কিংবা গুদামঘর আছে। বাসা আছে ট্রাংকপট্টি, গিরীশ চক্রবর্তী রোড, ঈশান চক্রবর্তী, হরিকিশোর রায় রোডসহ বেশ কিছু এলাকায়। এলাকার কারো পক্ষেই জানা সম্ভব না এগুলো সরকারি মালিকানার জমি কিংবা স্থাপনা। একই অবস্থা খাসজমির ক্ষেত্রে।

এসব জমি নিয়ে স্থানীয় লোকজনের ধারণা একেবারে অস্পষ্ট। সময়ের ব্যবধানে অনেক সরকারি জমি দখল-বেদখল হয়ে যেতে দেখেছে ময়মনসিংহবাসী। নগরীর কালীবাড়ি এলাকায় এসকে হাসপাতালের পেছনের একটি পুকুর এখন ভরাট হয়ে মাঠ। অথচ বিশালাকার পুকুরটি এলাকাবাসী সরকারি হিসেবেই জানত। পুকুরটি ভরাটকালে এলাকাবাসী লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানিয়েও ছিল। বর্তমানেও কেউ কেউ ভরাট হয়ে যাওয়া পুকুরটি নিয়ে হা-হুতাশ করে।

শহরের আরেক আলোচিত বিষয় ছিল আমলাপাড়া এলাকার পুকুর ভরাটের বিষয়টি। চোখের সামনে থাকলেও সরকারি হিসেবে পরিচিত এই জমি যেকোনো সময় সরকারের হাতছাড়া হতে পারে বলে শহরময় গুঞ্জন রয়েছে। সরকারের জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাও জেলায় একেবারে কম নয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুই হাজার ২০৬টি মামলা চলমান আছে। এসব মামলায় বিবিধ কারণে অনেক সময় সরকার তার জমির ওপর অধিকার হারাচ্ছে। সরকারের কোন কোন জমি নিয়ে মামলা আছে, তা-ও সহজে জানা-বোঝার উপায় নেই।

একাধিক নাগরিক বলেন, তাঁরা হয়তো জানেন যে কোনটি সরকারি জমি। কিন্তু হুট করে একদিন তাঁরা দেখেন সেই জমিতে ভবন উঠছে। ভবন মালিক বলছেন, এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যেহেতু কোনো তথ্য বা চিহ্ন প্রকাশ্যে নেই, তাই কেউ প্রকাশ্যে বিতর্কে যেতে পারেন না। প্রশাসনের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ ব্যাপারে বলেন, সরকারি জমি ও বাড়ির অবস্থান চিহ্নিত করা এবং প্রকাশ্যে এগুলোর তথ্য জানানো খুবই দরকার। সারা দেশেই সরকারের সব দপ্তর এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারে।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকারি জমি রক্ষা, ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা সব সময়ই সচেষ্ট।’ জমি ও স্থাপনা চিহ্নিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।

মন্তব্য