kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী

সৈয়দ হকের সমাধি সংরক্ষণ করতে না পারা লজ্জার

আলমগীর শাহরিয়ার   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সৈয়দ হকের সমাধি সংরক্ষণ করতে না পারা লজ্জার

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক শায়িত আছেন তাঁর জন্মস্থান প্রিয় কুড়িগ্রামে। ধরলা নদীর অদূরে। যে নদীর কথা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বারবার। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের শিল্প ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জনপদ কুড়িগ্রামে লেখকের কবরে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে গিয়ে খুব ব্যথিত হয়েছি। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সুপরিসর ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বারে বড় অবহেলায় পড়ে আছে বাংলা ভাষার বিরলপ্রজ এ লেখকের কবর। যিনি মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে পেয়েছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। এত অল্প বয়সে বাংলা ভাষার আর কোনো লেখকের এ পুরস্কার পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সাহিত্যকীর্তির জন্য যিনি পেয়েছেন একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার।

সৈয়দ শামসুল হক শুধু নিভৃতচারী লেখক বা তাত্ত্বিক ছিলেন না, দেশ ও জাতির সংকটে সব সময় সক্রিয় ছিলেন একজন সাহসী সমাজসচেতন লেখক ও শিল্পীযোদ্ধা হিসেবে রাজপথে। নিছক শিল্পের দায় নয়, সমাজ-প্রগতি ভাবনার প্রতিও তাঁর ছিল সমান অঙ্গীকার। প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে জাতীয় কবিতা উৎসব, শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র—নানা জায়গায় অনেকবার তাঁকে দেখেছি, শুনেছি। গণমাধ্যমে কাজ করার সময় বেশ কয়েকবার বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া নিয়েছি। কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতেন তিনি। যেন মঞ্চে সচেতন শিল্পী আবৃত্তি করে চলেছেন। ছিলেন খুবই ফ্যাশনসচেতন। পরিপাটি থাকতে, জীবনকে উদ্‌যাপন করতে পছন্দ করতেন। জিনস তাঁর পছন্দের পোশাক ছিল। পৌঢ়ত্বে পৌঁছেও গলায় সোনার চেইন পরতে দেখা যেত। হাতে ব্রেসলেট, অনামিকা ও মধ্যমায় থাকত রিং। যেন সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা সপ্রতিভ তরুণ। পঞ্চাশ ও ষাটের স্বর্ণসন্তান সৈয়দ হকের মতো লেখকরা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মনোজগৎ বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর রচিত আত্মজীবনী ‘প্রণীত জীবন’-এর পরতে পরতে আছে জন্মস্থান, শৈশব, ধরলা নদী, জননী হালিমা খাতুন, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পিতা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন আর পূর্বপুরুষদের যাপিত জীবনকে ঘিরে কত অম্লমধুর স্মৃতির বয়ান। তিনি লিখেছেন বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘পরানের গহীন ভিতর’ ও ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’। তিনি যদি শুধু তাঁর আলোচিত দুটি কাব্যনাট্য ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ লিখে যেতেন তাহলেও আমরা চিরদিন তাঁকে স্মরণ করতাম। ‘জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়’ উপনিবেশ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের বিপ্লব আর বিদ্রোহী চেতনার মন্ত্রে উজ্জীবিত ধ্বনি। কবিতাটি হয়ে ওঠে জাগরণের গান। তাঁর লেখা কবিতা ‘আমার পরিচয়’ আমাদের আবৃত্তি করতেই হবে।

নিজ জাতিসত্তা ও শিল্পচেতনার সঙ্গে আমৃত্যু আপস না করা এ কবি ঢাকার বনানী বা বুদ্ধিজীবী কবরস্থান নয়, শৈশব-কৈশোরের কুড়িগ্রামেই সমাধিস্থ হতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর চার বছরেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বাংলাদেশের ও বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সমাধিস্থল। তাঁর সহধর্মিণী লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক ও আত্মজ দ্বিতীয় সৈয়দ হকও দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন কবরটি সংরক্ষণে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। ব্যর্থ হলে পারিবারিক উদ্যোগে তাঁরা শিগগিরই সংরক্ষণ করবেন।

এ দেশে অনেক কালোবাজারি, চোর, ডাকাত, দুর্বৃত্ত, জাতির পিতার খুনি, রাজাকার, দেশদ্রোহীদের কবরও গৌরব দিয়ে সংরক্ষণ করা হচ্ছে; অথচ দেশের অন্যতম প্রধান লেখকের সমাধিস্থল পড়ে আছে অবহেলায়। এ বড় লজ্জার। অথচ কুড়িগ্রামে সৈয়দ হকের সমাধিস্থল হওয়ার কথা ছিল অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান। তাঁর সমাধি প্রাঙ্গণ হোক পরিকল্পিত একটি মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স। দেশসেরা স্থপতিকে দিয়ে ডিজাইন করা হোক কমপ্লেক্সটির। সৈয়দ হক তাঁর সৃষ্টির জন্য পাঠকের স্মৃতিতে অম্লান থাকবেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণে লেখক সৈয়দ হকের কাছে আমাদের ঋণ আছে। তাঁর বহুমাত্রিক শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার খোঁজ করবে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা, দেখতে যাবে তাঁর সমাধিস্থলও। তাই সমাধি প্রাঙ্গণটি গৌরবোচিতভাবে সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের অবশ্যকর্তব্য।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

মন্তব্য