kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

মানবপাচারকারী বিজন-হিমুচক্রের ফাঁদ

‘আরো ৫২ হাজার টাকা দিয়ে দেশে ফিরি’

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আরো ৫২ হাজার টাকা দিয়ে দেশে ফিরি’

বাবা রিকশা চালান। সংসারে অভাব লেগেই থাকে। বসতবাড়ি বন্ধক রেখে এবং বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করে হিমুকে দিই। একটি তেল কম্পানিতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সে আমাকে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রুনাইয়ে নিয়ে যায়। তখনও জানতে পারিনি যে ফাঁদে পড়েছি। এরপর তিন দিন একটি বাসায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। আমিনুর রহমান হিমু ও তার লোকজন কোনো খোঁজ নেয়নি। চার দিনের মাথায় সাইদ নামে একজন দালাল আমাকেসহ আরো ৬০ জন বাংলাদেশিকে অন্য একটি বাসায় নিয়ে আটকে রাখে। সেখানেও চার দিন ঠিকমতো খাবার দেয়নি। ঘুমাতে পারিনি। এরপর পুলিশ এসে আমাদের আটক করে পাসপোর্ট চায়। কিন্তু পাসপোর্ট দালালরা আগেই নিয়ে নেওয়ায় দেখাতে পারিনি। তখন বুঝতে পারি বিপদে পড়েছি। প্রতারকচক্রের ফাঁদে পড়েছি। পরে দেশে ফোন করে বাবাকে সব খুলে বলি। মা-বাবা কান্নাকাটি করে। ফের ধার করে ২০ হাজার টাকা পাঠায়। কিন্তু এই টাকা দিয়েও পাসপোর্ট ফিরে পাইনি। পরে আরো ৩৫ হাজার টাকা নেয় হিমুর দালাররা। এরপর পাসপোর্ট ফিরে পেলেও তারা কোনো কাজ দিতে পারেনি। চরম হতাশার মধ্যে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি। এভাবে তিন মাস খেয়ে না খেয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে থেকে অবশেষে বাবার কাছে আরো ৫২ হাজার টাকা চাই। বাবা ধারদেনা করে ওই টাকা পাঠালে গত ২ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসি।

গতকাল বৃহস্পতিবার এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের দুর্দশার কথা বলছিলেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী গ্রামের রিকশাচালক রেজাউল মোল্লার ছেলে জিয়া মোল্লা। তাঁর মতোই তাজউদ্দিন, শহিদুলসহ আরো বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এঁরা সবাই জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে ব্রুনাইয়ে গিয়েছিলেন নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে। কিন্তু মানবপাচারকারী আমিনুর রহমান হিমু ও তার সহযোগীদের খপ্পরে পড়ে আজ তাঁরা নিঃস্ব, পথের ফকির।

হিমুকে গত বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে এনএসআই ও র‌্যাব তার দুই সহযোগী নুর আলম (৩৬) ও বাবলুর রহমান (৩০)সহ গ্রেপ্তার করে। এ সময় হিমুর  দেহ তল্লাশি করে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলিভর্তি ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। তাদের আসামি করে ভুক্তভোগী জিয়া মোল্লা বাদী হয়ে কাফরুল থানায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মামলা করেছেন। ওই মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর পরও হিমু ও মেহেদী হাসান বিজনসহ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীচক্রের সদস্যরা গ্রামের সহজ-সরল দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মোটা অঙ্কের বেতনের কথা বলে বিদেশে নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। তদন্তে এখন পর্যন্ত র‌্যাব জানতে পেরেছে, ব্রুনাইয়ে এ পর্যন্ত ৪০০ জনকে পাচার করে হিমু-বিজনসহ মানবপাচারকারীচক্রের সদস্যরা হাতিয়ে নিয়েছে ৩৩ কোটি টাকা। অথচ এদের কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স নেই। তারা হিমু নজরুল ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ও হাইওয়ে ইন্টারন্যাশনাল আরএল—এই দুটি প্রাতিষ্ঠানিক নাম ব্যবহার করে ব্রুনাইয়ে মানবপাচার করে। এদিকে র‌্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, ৩৩ কোটি নয়, হিমু ও বিজনচক্রের সদস্যরা অন্তত ৫০ কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারণার মাধ্যমে। চক্রের প্রধান বিজনকে ধরলে এর আদ্যোপান্ত জানা যাবে।

মানবপাচারকারীচক্রটি বেশির ভাগ সময় ব্রুনাইয়ে থাকত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা বর্তমানে দেশে এসে আত্মগোপনে ছিল। র‌্যাব তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, শুধু হিমু নয়, বিজনও দেশেই আছে। সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিমু গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়ে র‌্যাব-৩-এর প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাকিবুল হাসান গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হিমুকে গ্রেপ্তার করে বিজনকে ধরার চেষ্টা চলছে। বিজন দেশেই আছে। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ২০টি মামলা রয়েছে।’

র‌্যাব জানায়, বর্তমানে ব্রুনাইয়ে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক অবস্থান করছে। এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ মানবপাচারকারীচক্রের মাধ্যমে ব্রুনাই গিয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি মালিকানায় প্রায় তিন হাজার  কম্পানি নিবন্ধিত আছে। যার বেশির ভাগই নামসর্বস্ব। এসব  কম্পানি ভুয়া-বানোয়াট প্রকল্প দেখিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্রুনাই থেকে কর্মসংস্থান ভিসা লাভ করে তা দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিক্রি করে। ব্রুনাইয়ে যাওয়ার জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও, সেখানে চাকরির কথা বলে প্রতিজনের কাছ  থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা নিত চক্রটি। তবে ব্রুনাইয়ে কোনো চাকরি না পেয়ে উল্টো জেল খেটে  দেশে ফিরছেন এসব প্রবাসী।

বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিলের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে বলে জানায় র‌্যাব। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পাসপোর্ট অধিদপ্তর মেহেদী হাসান বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিল করে।

প্রসঙ্গত, গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ব্রুনাইকেন্দ্রিক বাংলাদেশি মানবপাচারকারী দালাল মেহেদী হাসান বিজনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করে।

মন্তব্য