kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অপরাধ প্রমাণের আগেই মিডিয়ার সামনে আসামি

এম বদি-উজ-জামান ও এস এম আজাদ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অপরাধ প্রমাণের আগেই মিডিয়ার সামনে আসামি

অপরাধের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলার আগে এবং পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের আগে কোনো আসামিকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন না করার জন্য আগে থেকেই নির্দেশনা আছে হাইকোর্টের। কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। গ্রেপ্তারের পর আসামিদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোগোসংবলিত বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে গণমাধ্যমের সামনে প্রদর্শন করা হয়। তবে আদালতের নির্দেশনার পর আগের মতো আর বুকে অপরাধীর নাম লিখে দেখানো হচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। প্রশ্ন তোলা হয়েছে আসামির স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়েও। নারায়ণগঞ্জে ‘নিহত’ স্কুলছাত্রীর জীবিত ফেরত আসার ঘটনায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া নিয়ে হাইকোর্টে চলমান এক রিট মামলায় বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের পূর্বশর্ত হলো কথা কম বলা। কোনো মামলার তদন্ত সঠিক হতে হলে সবাইকে চুপ থাকতে হবে। কিন্তু এখন কোনো একটা ঘটনা ঘটলে দেখা যায়, তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বুকে সাইনবোর্ড লাগিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হয়। এমনকি রাতে সেই ঘটনা নিয়ে টক শো শুরু হয়। ঘটনা নিয়ে কত রকম বিশ্লেষণ শুরু হয়ে যায়। মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা হয়, যা তদন্ত কার্যক্রমকে ব্যাহত করে, প্রভাবিত করে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরা উচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ভিন্ন ইউনিট ভিন্ন আসামি উপস্থাপন করায় বিভ্রান্তির ঘটনাও ঘটছে। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে আদালত অবমাননা হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এটি থেকে বিরত থেকে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা। মানবাধিকারকর্মীরা এসব ঘটনাকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ অভিহিত করছেন। তাঁরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় অপরাধ প্রমাণের আগেই আসামিকে সাধারণ মানুষ অপরাধী বলে বিবেচনা করে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, স্পর্শকাতর মামলার আসামিদের নিরাপত্তার জন্যই জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো হয়। আদালতের নির্দেশনার কারণে আসামিদের ছবি দেওয়া হয় না এখন। তবে গণমাধ্যমকর্মীরা চলাচলের সময় ছবি তুলে নেন।

গত শনিবার দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রবিউল ইসলামকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে পুলিশ। এর আগে র‌্যাব যুবলীগ নেতা আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। দুজনই দায় স্বীকার করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য অবশ্য বলেন, ‘এদের স্বীকারোক্তি শেষ কথা নয়। আরো তদন্ত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।’ এর আগে গাজীপুরের শ্রীপুরে মালয়েশিয়াপ্রবাসীর স্ত্রী ও তিন সন্তানকে হত্যার ঘটনায় ২৯ এপ্রিল অনলাইন ব্রিফিংয়ে পাঁচ আসামির তথ্য দেয় র‌্যাব। ২৭ এপ্রিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) পারভেজ নামের একজনই জড়িত বলে জানায়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই বিভাগীয় পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পিবিআই, সিআইডিসহ বিভিন্ন ইউনিট আসামি গ্রেপ্তারের পর গণমাধ্যমের সামনে বিভিন্নভাবে প্রদর্শন করে। এতে বুলেট প্রুফ জ্যাকেটসহ আসামিদের বিভিন্ন ধরনের ছবি গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশিত হচ্ছে।

ফেনসিডিল উদ্ধারসহ জাবেদ ইমাম নামের একজন বিচারক গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করার ঘটনায় করা এক রিট আবেদনে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি একটি আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, সন্দেহভাজন হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে কিংবা মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের পর গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় বা আসামির বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এর পরদিনই ওই আদালতে লিখিত প্রতিবেদন দিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, আটককৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে আর হাজির করা হবে না। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশ পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যদের সব দপ্তরে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এরপর ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ গাজীপুরে বোমা হামলা মামলার আসামি জেএমবি সদস্য মামুনুর রশিদ জাহিদের মামলায় আসামিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরত থাকতে বলেন। একই আদালত গত বছরের ২৯ আগস্ট বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় আসামি আয়শা সিদ্দিকী মিন্নির জামিন মঞ্জুর করে দেওয়া এক রায়ে আসামিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে বিরত থাকতে বলেন।

মন্তব্য