kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বন্ধের পথে ২৫ শতাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান

যে কারণে বাড়ছে সোনার দাম

রোকন মাহমুদ   

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা জুবায়েরের বিয়ে ঠিক হয় মার্চের আগে। পাকা কথার সময় ঠিক হয়েছিল কনেকে তিন পদের গয়না দেবেন। কিন্তু এখন আর দিতে পারছেন না। কারণ সোনার দাম অনেক বেড়ে গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাইতুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় কথা হয় জুবায়েরের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ‘সোনার যে দাম তাতে কেনা সম্ভব নয়। একেবারে না দিলেই নয়, তাই আপাতত কানের দুল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি দাম আরো বেড়েছে। যদি কনেপক্ষকে মানাতে পারি, তবে এটাও পরে দিব।’

জুবায়েরের মতো বিপাকে পড়ে অনেকেই গয়না কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা মহামারির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে ‘খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে দফায় দফায় সোনার দাম বৃদ্ধি। তাই বেচাবিক্রি একেবারে কম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু যে ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন তা নয়, লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। বিক্রি কমেছে ৭০-৮০ শতাংশ।

সোনার দাম কেন এভাবে বাড়ছে—এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, করোনাভাইরাসের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রে ও চীনের মধ্যকার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দুর্বল হয়ে পড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ খ্যাত সোনা কেনায় ঝুঁকছেন। এতে দামও বাড়ছে। সর্বশেষ বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স দুই হাজার ৪১ ডলারে উঠেছে। এই বছর সোনার দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্ববাজারে ৯ মার্চ প্রতি আউন্স (৩১.১ গ্রাম) সোনার দাম ছিল এক হাজার ৬৭৪ মার্কিন ডলার। এর আগে সর্বশেষ ২০১১ সালে ৬ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে সর্বোচ্চ এক হাজার ৯২৩ ডলার উঠেছিল।

যদিও বাংলাদেশের মানুষ বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বরং ব্যবহারের জন্য সোনা কেনেন। তার পরও দফায় দফায় দাম বাড়ছে। সর্বশেষ গত বুধবার এক ধাক্কায় ভরিতে চার হাজার ৪৩২ টাকা দাম বেড়ে ৭৭ হাজার ২১৫ টাকা হয়। ২৩ জুন পর্যন্ত দেশে ভালো মানের সোনার দাম ছিল ৬০ হাজার ৩৬১ টাকা ভরি। অর্থাৎ ৪৩ দিনে তিন দফায় সোনার দাম বেড়েছে ১৬ হাজার ৮৫৪ টাকা। ২৪ জুন পাঁচ হাজার ৮২৫ টাকা, ২৪ জুলাই দুই হাজার ৯১৬ টাকা বাড়ে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি এনামুল হকের দাবি, অনেকের বিক্রি শূন্যের কোটায়। যেটুকু হয় তা দিয়ে দোকান ভাড়া, দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যায় না। ফলে ২৫ শতাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে রয়েছে। বড় ব্র্যান্ডগুলো আউট লেটের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে। যারা টিকে থাকার লড়াই করছে তারা কর্মী কমাচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। ৭০-৮০ শতাংশ স্বর্ণশিল্পি বেকার হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়ুক এটা আমরাও চাই না। আমরা নিজেরাও দাম বৃদ্ধির আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।’

গতকাল বিকেল ৫টায় বাইতুল মোকাররমের আমিন জুয়েলার্সের শো রুমে ঢুকে দেখা গেল, ১৩ জন বিক্রয়কর্মী নিজেদের মতো গল্প করছেন। দুইজন ক্রেতাকে গয়না দেখাচ্ছিলেন দুইজন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মিত্তাকুর রহমান বলেন, ‘বিকেলের এই সময়টাতে আমাদের ব্যস্ততা থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এখন অলস সময় পার করছি। আগের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ বেচাবিক্রি হয়। নতুন করে দাম বাড়ার কারণে এটি আরো কমতে পারে বলে আশঙ্কা।’ তিনি বলেন, বড় ব্র্যান্ডগুলো না হয় কোনো মতে টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের কী হবে! এই বাজারে তাদের টিকে থাকা কষ্টকর।

একই মার্কেটের বুলবুল জুয়েলার্সের মালিক জুয়েল বলেন, ‘আমার পুঁজি প্রায় শেষ। আমি এখন ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি কিছু টাকা লোনের জন্য। কোনো ব্যাংকই লোন দিচ্ছে না।’

স্বর্ণালী জুয়েলার্সে ছিল ১০ জন কর্মী, এক জন ক্রেতা। জানতে চাইলে আল আমিন নামের ওই ক্রেতা বলেন, ‘ছোট বোনের মেয়ে হয়েছে। একেবারে খালি হাতে যাওয়া যায় না, তাই একটি ছোট কিছু কিনতে এসেছিলাম; কিন্তু যে বাজেট নিয়ে এসেছিলাম তা দিয়ে পছন্দমতো কিছুই হচ্ছে না।’

অবস্থা আরো খারাপ পাড়া-মহল্লা কিংবা বাজারের ছোট ছোট সোনার দোকানগুলোর। শুধু পুরনো গয়না মেরামতের টুকটাক কাজ করে পেট চালাচ্ছেন কারিগররা। বিক্রি না থাকায় দোকানে গয়নাও রাখছেন না।

ঢাকা নিউ মার্কেটের জুয়েলারি ব্যবসায়ী দেওয়ান আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। রোজার ঈদের পর থেকে পারিবারিকভাবে অল্প কিছু বিয়েশাদি হলেও বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে না। ফলে একটি আংটি কিংবা একটি গলার চেন দিয়ে কাজ সারছে বেশির ভাগ মানুষ।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে ১০ হাজারের মতো সোনার দোকান রয়েছে। তার মধ্যে জুয়েলার্স ব্র্যান্ডসংখ্যা হাতে গোনা ১৫-২০টি। বাকিগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। জুয়েলারির জন্য গয়না তৈরি করেন প্রায় ৫০ হাজার কারিগর। শুধু পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারেই কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার কারিগর। ৯৯ শতাংশই মাসিক কোনো মজুরি পায় না। এক ভরি বা ১৬ আনা সোনার গয়না বানালে তাঁরা পান দুই আনা সোনা। বর্তমানে কাজ না থাকায় খরচ বাঁচাতে তাঁতীবাজারের বেশির ভাগ কারিগরই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন।

স্বর্ণশিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক দীনেশ পাল বলেন, করোনাকালে ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন সোনার কারিগরেরা। বর্তমানে পুরো তাঁতীবাজার খুঁজলেও হাজারখানেক কারিগর পাওয়া যাবে না। কাজ না থাকায় সংসার চালাতে অনেকেই হকারি করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা