kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কারেন্ট সুদ!

কপিল ঘোষ, চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট)   

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কারেন্ট সুদ!

অবৈধ সুদ কারবারিদের ফাঁদে পড়ে পৈতৃক ভিটা হারিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে বাস করেন প্রকাশ বালা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চিতলমারীতে চক্রবৃদ্ধির ফাঁদ

►          সুদের হিসাব সাপ্তাহিক

►          বিদ্যুদ্গতিতে বাড়ে

►          এক সপ্তাহ কিস্তি দিতে না পারলে তা যুক্ত হয়ে আসলে পরিণত হয়

►          দেড় লাখ টাকা এক বছরে ১০ লাখ

►          বাড়ি-ভিটা বেচেও ঋণমুক্তি হয় না

►          চাপে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন

 

ব্যাংক বা বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সুদ হিসাব হয় মাসিক। কিন্তু বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় কারবারিরা সুদের হিসাব কষেন সাপ্তাহিক। কোনো কারণে এক সপ্তাহ কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে তা যুক্ত হয়ে আসলে পরিণত হয়। স্থানীয়রা একেই বলেন কারেন্ট সুদ। কারেন্ট বা বিদ্যুতের গতিতে বাড়ে বলে এমন নাম।

ভালোবেসে ধার দেয় টাকা

ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমে কারবারিরা ভাব জমান। পরিবারে আত্মীয়ের মতো যাতায়াত শুরু করেন। পরে দুর্বলতার সুযোগ বুঝে টাকা ধার দেন। বলেন, অন্যের কাছ থেকে এনে দিয়েছেন। অভাবগ্রস্ত পরিবার কৃতজ্ঞতায় নতমুখী হয়ে থাকে। সময়মতো সেই টাকা পরিশোধ না করলে, ভালোবেসে ধার দেওয়া টাকা সুদে পরিণত হয়। সেই টাকার ওপর সপ্তায় সপ্তায় সুদ বাড়ে। এভাবে একসময়ের ধারকৃত টাকার চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি পরিশোধ করলেও দেনা শেষ হয় না। কারবারিরা শুরু করেন দুর্ব্যবহার। এই অবস্থায় কাকতালীয়ভাবে আরেকজন সুদ কারবারি ওই পরিবারের দুঃসময়ে পাশে এগিয়ে যান। কিছু টাকা ধার দেন।

এতে প্রথমজনের সব টাকা পরিশোধ হয় না; কিন্তু ঋণের সংখ্যা বাড়ে। সুদ কারবারিদের ফাঁদে ফেঁসে যায় পরিবার। তাঁদের অত্যাচারে বিক্রি করতে হয় জায়গা, ভিটেমাটি, বাড়ি। তবু সুদ কারবারির দেনা শোধ হয় না। অত্যাচারে সম্মানহানি হয়ে ও দেনা শোধ করতে না পেরে কেউ আত্মহত্যা করেন, কেউ এলাকা ছেড়ে নিরুদ্দেশ হন। আর অর্থবিত্তে জীবন যাপন করেন কারবারিরা।

আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, গত ২০ জুলাই দক্ষিণ শিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসিকনা বিশ্বাসের (৩৮) গলায় ফাঁস লাগানো মৃতদেহ উদ্ধারের পর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়। এই মামলায় দুই সুদ কারবারি আটক হন। অন্যদের ধরতে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে। আজিজুল হক আইডিয়াল একাডেমির প্রধান শিক্ষক যুগল ডাকুয়া তাঁদের শেষ সম্বল খড়মখালী গ্রামের বসতবাড়ি ও এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, তিন বছর আগে ঘরসহ ৩২ শতাংশ জায়গা কিনে যুগল ও হাসিকনা বসবাস শুরু করেন। ওই জায়গা কিনতে তাঁদের কিছু টাকা ধার নিতে হয়। সেই ধারের টাকা দেনায় পরিণত হয়ে ওই সুদচক্রের কৌশলে আটকে পড়েন। ফলে তাঁরা এখন সর্বস্বান্ত।

এলাকাবাসী জানায়, সুদের চাপ সইতে না পেরে গত কয়েক বছরে আত্মহত্যা করেন কালশিরা গ্রামের ভাস্কর রামপ্রসাদ মালাকার, রুইয়ারকুল গ্রামের সনজিৎ ব্রহ্ম, সুরশাইল গ্রামের মাওলানা হারুন।

ভিটা হারানোর কথা

চরবানিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য হরেকৃষ্ণ বালার ছেলে প্রকাশ বালা (৩২) জানান, প্রায় তিন বছর আগে অতিবর্ষণে তাঁর চিংড়িঘের তলিয়ে সব মাছ ভেসে যায়। মাছের খাবারের দোকানে দেনা বাড়ে। এ সময় ভালোবাসার ভাব দেখিয়ে একজন এগিয়ে আসেন। ৫০ হাজার টাকা ধার দেন। কিছুদিন পর তাঁর টাকা ফেরত চান। ওই পাওনা দিতে না পারায় মাথায় ওঠে সুদের বোঝা। ওই টাকা পরিশোধ করতে আরো চার-পাঁচজনের সুদের জালে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আনা মোট দেড় লাখ টাকার সুদ এক বছরের মাথায় গিয়ে ১০ লাখ টাকায় পরিণত হয়। সুদের টাকা আদায়কারী বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে প্রথমে বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে যান। কিন্তু এভাবে কত দিন? সুদ কারবারিদের সঙ্গে আপস করতে বেচেন চিতলমারী বাজারে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোকানঘর ও জায়গাজমি। এখন তিনি বর্গা চাষি।

প্রশাসনের অবস্থান

চিতলমারী থানার পরিদর্শক মীর শরিফুল হক জানান, সুদ কারবারিদের বিরুদ্ধে শিক্ষক হাসিকনা আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায় হয়েছে। আড়ুয়াবর্নি গ্রামের রেফাজুল খাঁ (৩৮) ও কুড়ালতলা গ্রামের সুনীল বিশ্বাসকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অবৈধ সুদ কারবার বন্ধের জন্য পুলিশ কাজ করছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফুল আলম জানান, স্কুল শিক্ষিকার ঘটনাটি দুঃখজনক। অবৈধভাবে অর্থলগ্নিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রক্রিয়া চলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নেমেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা