kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

কুমিল্লায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী হত্যা

কাউন্সিলর সামনে থেকে খুনের নেতৃত্ব দেন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা   

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাউন্সিলর সামনে থেকে খুনের নেতৃত্ব দেন

আলমগীর হোসেন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর। একসময় বিএনপির ‘মধু’ খাওয়া এই নেতা এখন যুবলীগের ‘জাঁদরেল’ নেতা। পদটিও বড়, কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাঁকে ধরতেই পুলিশ রীতিমতো গলদঘর্ম। দিনের আলোতে সবার সামনে ব্যবসায়ী আক্তার হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁর মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং চলছে। দিনরাত অভিযান চলছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারাও রয়েছেন পুলিশের চোখে চোখে। তার পরও মিলছে না খোঁজ। তবে খুন হওয়া আক্তার হোসেনের পরিবার কিন্তু ঠিকই হুমকি-ধমকি পাচ্ছে। গতকাল শনিবারও পেয়েছে জীবন হারানোর ‘ধমক’। নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি এরই মধ্যে আক্তারের পরিবার প্রশাসন এবং পুলিশকেও জানিয়েছে। এ হত্যার ঘটনায় তিন আসামিকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনজনই কাউন্সিলর আলমগীরের আপন ভাই। তাঁরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন ও আমির হোসেন।

গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে কুমিল্লার সদর দক্ষিণের চাঙ্গিনী দক্ষিণ মোড়ের বায়তুল নূর জামে মসজিদের সামনে কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন ও তাঁর ভাইয়েরা দলবল নিয়ে আক্তার হোসেনকে পাইপ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন। গতকাল দুপুরে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল বাদ আসর গন্ধমতি জামে মসজিদে আক্তার হোসেনের জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

দাফনের সময় আক্তার হোসেনের ছোট ভাই শাহজালাল আলাল অভিযোগ করেন, ‘আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানাভাবে আমাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। গতকালও তারা হুমকি দিয়েছে।’

আক্তারের স্ত্রী রেখা বলেন, ‘কাউন্সিলর নির্বাচনের সময় আমরা আলমগীরের পক্ষে কাজ করেছিলাম। শুক্রবার যখন আমার স্বামীকে মারছিল তখন আমরা আলমগীর, জাহাঙ্গীরের কাছে মাফ চাইছিলাম। আমাদের মাফ করে দে। কিন্তু মাফ করে নাই। আমার স্বামীরে মাইরাই ফেলছে।’

খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আক্তারের বড় মেয়ে শিরিন আক্তার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার মা। তাঁর কাছে বাবা হত্যার বিচার চাই।’

এদিকে চাচাতো ভাই আক্তার হোসেনকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কাউন্সিলর ও তাঁর পাঁচ ভাইসহ ১০ জনকে আসামি করে আক্তারের স্ত্রী রেখা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় হত্যা মামলা করেছেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কাউন্সিলরের তিন ভাইকে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল আদালত বন্ধ থাকায় তাঁদের জেলহাজতে নেওয়া হয়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে কাউন্সিলর আলমগীর হোসেনকে। আসামি অন্য পাঁচ ভাই হলেন আমির হোসেন (৫৫), বিল্লাল হোসেন (৪০), জাহাঙ্গীর হোসেন (৫২), তোফাজ্জল হোসেন (৪৫) ও গুলজার হোসেন (৫৩)। অন্যরা হলেন গুলজার হোসেনের ছেলে নাজমুল ইসলাম আলিফ (২৪) ও নাজমুল ইসলাম তানভীর (২২), তুলাতলীর মো. ইউনুসের ছেলে কাউসার আহাম্মেদ ভুট্টু (২৬) ও আমির হোসেনের ছেলে জোবায়ের হোসেন (২৮)।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, কাউন্সিলর আলমগীর তাঁর হাতে থাকা এসএস পাইপ দিয়ে আক্তার হোসেনের ঘাড়ে আঘাত করেন। অন্যরা এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি, লাথি মেরে জখম করে। কাউন্সিলরের ভাই জাহাঙ্গীর ইট দিয়ে মেরে আক্তার হোসেনের হাঁটু থেঁতলে দেন। পরে লোকজন অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তিনি মারা যান।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, কাউন্সিলর আলমগীর হোসেন অবশ্যই ধরা পড়বেন। তাঁর সঙ্গে যারা ছিল তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। কারণ এটা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটেছে।

অভিযোগের ফিরিস্তি : বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়া কাউন্সিলর আলমগীর ও তাঁর ভাইদের নামে এলাকায় অভিযোগের ফিরিস্তি বেশ লম্বা। চাঁদাবাজি, সালিসের নামে টাকা ভাগাভাগি, বিরোধপূর্ণ জমিতে ভাগ বসানো এবং মাদক কারবার তাঁদের নিত্যদিনের কাজ। আপন চাচাতো ভাইয়ের পাঁচ শতক জমি ক্ষমতার ধমকে দখল করে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর আলমগীরের বিরুদ্ধে।

২০০৬ সালে বিএনপি করতেন আলমগীর। কিন্তু সিটি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের ‘টিকিট’ পান। পরে পেয়ে যান কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ। পদ ও ক্ষমতা পেয়ে তিনি দিন দিন হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। কোটবাড়ী সড়কের পাশে ড্রেন নির্মাণের সময় তোলা মাটি বিক্রি করে আলোচনায় আসেন কাউন্সিলর আলমগীর। তাঁর এক ভাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে সহকারী প্রকৌশলী তফাজ্জল হোসেনের সহায়তায় এলাকার ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করেন। আরেক ভাই জাহাঙ্গীর মাদক কারবারের ‘ওস্তাদ’। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন,  ‘কাউন্সিলর নিজেও হামলায় অংশ নিয়েছেন, এর প্রমাণ পেয়েছি। একজন জনপ্রতিনিধি এত মানুষের সামনে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা