kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

আম পরিবহনে ‘ম্যাংগো স্পেশাল’

ট্রেনে নানা ঝক্কি, ভাড়াও বেশি

গত শুক্রবার থেকে রেলসেবায় যুক্ত হয় নতুন কৃষিপণ্যবাহী ট্রেন ‘ম্যাংগো স্পেশাল’

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ট্রেনে নানা ঝক্কি, ভাড়াও বেশি

এক দিন না যেতেই রাজশাহী থেকে ট্রেনে আম পাঠানোর আগ্রহ হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য পশ্চিমাঞ্চলে নতুন যোগ হওয়া ‘ম্যাংগো স্পেশাল’ নামের ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক ট্রাক আম রাজশাহী থেকে রাজধানীতে পৌঁছাতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। গ্রাম থেকেও ব্যবসায়ীরা ট্রাক ভরে নির্দিষ্ট আড়তে সহজে আম পৌঁছাতে পারেন। আবার এক ট্রাকে কমপক্ষে ১৬ হাজার কেজি আম পরিবহন করা যায়। এতে কেজিপ্রতি গড়ে খরচ হচ্ছে প্রায় ৯০ পয়সা। কিন্তু রাজশাহীর একই স্থান থেকে এক ট্রাক সমান আম ট্রেনে করে ঢাকায় পাঠাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এরপর রয়েছে আম বুকিংয়ের ঝামেলা। রয়েছে স্টেশনে পৌঁছানো ও সংগ্রহ করার ধকল। পাশাপাশি আছে সময়ক্ষেপণ।

রাজশাহীর দুর্গাপুরের আমচাষি ও পাইকারি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, তিনি দুর্গাপুরের আমগাছী বাজারে আম কেনার জন্য আড়ত করেছেন। সেখান থেকে আম কিনে সরাসরি ঢাকায় পাঠাচ্ছেন ট্রাকে করে। একটি ট্রাকে আম যাচ্ছে কমপক্ষে ১৬ হাজার কেজি। তাতে খরচ হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৪-১৫ হাজার টাকা। এই আম ঢাকার আড়তে একেবারে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। ফলে রাস্তায় আর নতুন করে কোনো খরচ হচ্ছে না। কিন্তু আমগাছী বাজার থেকে ট্রেনে করে ঢাকায় আম পাঠাতে হলে সেটিকে গাড়িতে করে আগে রাজশাহীর হরিয়ান স্টেশনে নিয়ে যেতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। আবার রেলস্টেশনে রয়েছে বুকিং করার ঝামেলা। আম নামানো এবং ট্রেনে ওঠানোর জন্য প্রতি ক্যারেটে (২৫ কেজি আম থাকে একেকটিতে) কমপক্ষে ৩০ টাকা করে কুলি খরচ। এরপর কেজিপ্রতি এক টাকা ১৭ পয়সা করে ট্রেনভাড়া দিতে হয়। সেই আম ঢাকায় পৌঁছার পর ঢাকা স্টেশনের কুলিদের আবার ট্রেন থেকে নামানো এবং গাড়িতে তুলে দেওয়ার জন্য ক্যারেট বা কার্টনপ্রতি ৩০ টাকা করে খরচ দিতে হবে। সেখান থেকে গাড়িতে করে আম নিয়ে যেতে হবে আড়তে। এভাবে এক ট্রাক আম ঢাকায় পৌঁছাতে হলে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু একটি ট্রাক রাজশাহী থেকে সন্ধ্যায় রওনা দিলেও সকাল হতেই আড়তের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে। এরপর খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সেই আম সকাল সকাল বিক্রি করা যাচ্ছে। কিন্তু ট্রেনে আগের দিন পাঠালে পরের দিন সকাল সকাল সেই আম বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

বানেশ্বর বাজারের আম ব্যবসায়ী বাবু বলেন, ‘বানেশ্বর হাট থেকে আম কিনে আমরা সরাসরি ঢাকায় পাঠাতে পারছি। কিন্তু চারঘাটের সরদা স্টেশনে নিয়ে যেতে আলাদা খরচ যেমন আছে, তেমনি বাড়তি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচও আছে। এসব মাথায় রেখে আমরা বড় ব্যবসায়ীরা ট্রেনে করে আম ঢাকায় পাঠাতে পারছি না।’

ঢাকার ব্যবসায়ী আকবর আলী বলেন, ‘যারা অল্প আম পাঠাচ্ছে তাদের জন্য ট্রেন সুবিধা। কারণ ১০-২০ মণ আম ট্রাকে করে একসঙ্গে পাঠাতে বা কুরিয়ার করতে বেশি খরচ হবে। কিন্তু এই অল্প আম দিয়ে তো ট্রেন চলবে না। ট্রেন চালাতে হলে যারা পাইকারি ব্যবসায়ী তাদের আমের দিকে টার্গেট করতে হবে। তবেই ট্রেন লোড হবে। আর সেটি করতে হলে আমের ভাড়া কেজিপ্রতি অর্ধেকে নামাতে হবে। তার পরই খরচ বাঁচলে মানুষ ট্রেনের দিকে ছুটবে।’

এদিকে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেনে আম পরিবহন অনেকটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন রাজশাহীর পবার আম ব্যবসায়ী অনিক। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবছর কুরিয়ারে ঢাকায় আম পাঠাতাম। এবার ট্রেনে পাঠাচ্ছি। রাজশাহীর কুরিয়ার সার্ভিসগুলো আমের মৌসুম এলেই ডাকাতি শুরু করে। প্রতি কেজি আম ঢাকায় পাঠাতে ১০-১৫ টাকা নেয়। সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে এসএ পরিবহন। তারা ঢাকার ভেতরে ১৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২০ টাকা কেজি নিচ্ছে। অন্যান্যগুলো ঢাকার ভেতরে ১০ টাকার কম নেয় না। ঢাকার বাইরে ১৫ টাকার নিচে না। এ অবস্থায় ট্রেনে আম পাঠাতে খরচ হচ্ছে কেজিতে এক টাকা ১৭ পয়সা। যদিও আম স্টেশনে পৌঁছাতে আবার স্টেশন থেকে নিয়ে যেতে আলাদা খরচ হচ্ছে। তারপর কুলি খরচ। কিন্তু তার পরও কেজিপ্রতি কমপক্ষে পাঁচ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।’ 

গত শুক্রবার থেকে রেলসেবায় যুক্ত হয় নতুন কৃষিপণ্যবাহী ট্রেন ‘ম্যাংগো স্পেশাল’। ওই দিন বিকেলে ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর রাজশাহী স্টেশন হয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ১ ও ২ নামের ট্রেন দুটি সপ্তাহে সাত দিনই এই রুটে আম-সবজিসহ বৈধ পণ্যসামগ্রী নিয়ে যাতায়াত করছে। স্টেশনের দূরত্বভেদে ভাড়া পড়বে সর্বনিম্ন ১ টাকা ১০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩০ পয়সা।

পশ্চিম রেলের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ফুয়াদ হোসেন আনন্দ বলেন, ‘ট্রেনের খরচ বিবেচনা করে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন ট্রেনটি কতটুকু সফল হবে তার ওপর নির্ভর করবে সব কিছু।’

মন্তব্য