kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা : বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিন নিয়ে শঙ্কা

মাসুদ রুমী   

৮ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



♦      বিশেষ ফ্লাইটে ছয় দিনেই ফিরেছেন ১৭২৬ জন

♦      শাহজালালে স্ক্রিনিংয়ে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত

♦      সংক্রমিত নয় মর্মে প্রত্যেকের আলাদা স্বাস্থ্য সনদ চায় বেবিচক

করোনাভাইরাসের সংকটে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ছোটখাটো অপরাধে এবং বেশি দিন সাজা ভোগ করা প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের বিশেষ ক্ষমায় কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সাধারণ ক্ষমা করে বিনা জরিমানায় এবং নিজেদের বিমানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে কয়েকটি দেশ। এমন প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা ২৯ হাজারের বেশি। দেশে এখন সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি ব্যক্তির প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু একসঙ্গে অনেকে চলে এলে যাঁদের প্রযোজ্য তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জায়গা নিশ্চিত করা বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আবার যাঁদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনকে।

জানা গেছে, কেউ যদি বাংলাদেশে আসার আগে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকেন বা ‘করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট’ নিয়ে আসেন তাহলে নিজের বাড়িতে কোয়ারেন্টিনের সুযোগ দেওয়া হবে। নয়তো তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ৫ মে পর্যন্ত দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফেরা তিন লাখ ২৭ হাজার ১০৬ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। শুধু চলতি মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই এসেছেন এক হাজার ৭২৬ প্রবাসী ও আটকে পড়া বাংলাদেশি। এর মধ্যে ৬ মে ফিরেছেন ১৩০ জন, ৫ মে ফিরেছেন ১৮৮ জন, ৪ মে ৩৬২ জন, ৩ মে ৩৩২ জন, ২ মে ২৫৫ জন, ১ মে ৪৫৯ জন। বেশির ভাগই এসেছেন মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত থেকে।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে কুয়েত থেকে ২৪৬ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাঁরা সবাই কুয়েতের কারাগারে আটক ছিলেন। মুক্তি দিয়ে জাজিরা এয়ারওয়েজে তাঁদের দেশে পাঠানো হয়। সাধারণ ক্ষমায় আত্মসমর্পণ করা চার হাজার ৪২৮ বাংলাদেশিকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশে পাঠানো হবে বলে কুয়েত সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে কুয়েত সরকার অনুমতি ও ছাড়পত্র পেয়েছে বলে দেশটির পত্রিকার খবরে জানানো হয়েছে। বাহরাইনের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ১৫০ বাংলাদেশি কর্মী সম্প্রতি ঢাকায় ফিরেছেন। এ ছাড়া দেশটিতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে চলমান সাধারণ ক্ষমায় অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আত্মসমর্পণ করছেন। তাঁদেরও পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সৌদি আরব চলতি মাসের মাঝামাঝি ওমরাহ করতে গিয়ে আটকে পড়া ১৪৪ বাংলাদেশির সঙ্গে ১৬৮ প্রবাসীকে (বিভিন্ন অপরাধে কারাগারে ছিলেন) বিশেষ বিমানে তুলে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। ওমানে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় দেশটির কারাগার থেকে বিশেষ ক্ষমায় মুক্তি দেওয়া ৭৫৮ প্রবাসী বাংলাদেশিকে তিন দফায় ওমান এয়ার ও সালাম এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কারাগার ও ডিটেনশন সেন্টার খালি করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরো কয়েকটি দেশ। যদিও বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাশা ছিল, করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে কোনো প্রবাসী ফেরত না আসুক। বিশেষ করে জরুরি ভিত্তিতে তৈরি হতে যাওয়া চার হাজার বিদেশফেরতের একসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টারের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তার আগেই বিভিন্ন দেশ প্রবাসী কর্মীদের দলে দলে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, কোনো কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিকে যেন উড়োজাহাজে ওঠানো না হয়। তার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। দেশে আসার পর তাদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের ক্যাপাসিটির বাইরে যাতে কাউকে আনা না হয়। যারা কভিড-১৯ সার্টিফিকেট আনতে পারবে না, তাদের অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে। আর সার্টিফিকেট আনলে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে।’

মফিদুর রহমান আরো বলেন, ‘ওমানের একটা ফ্লাইটে সবার যৌথ সার্টিফিকেট দিয়েছিল দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমরা বলেছি, প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে আলাদাভাবে সার্টিফিকেট আনতে হবে। এখন থেকে সেটাই মেন চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ফেরত পাঠাতে চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি বলেছেন, ‘গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তিন হাজার ৬৯৫ জন বাংলাদেশি ফিরে এসেছেন। এমন প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী হতে পারে প্রায় ২৯ হাজার জন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরছেন। ওই কর্মীরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সেখানে বিভিন্ন অপরাধ করে কারাগারে সাজা খাটছিলেন। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকার তাঁদের ক্ষমা করে নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছে।’

এদিকে নিজ দেশে ফেরার জন্য অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে কুয়েত সরকার। এ ক্ষেত্রে যাঁরা নিজ দেশে বা বাংলাদেশে ফিরতে চান তাঁদের কোনো জরিমানা, বিমান ভাড়া দিতে হবে না। বরং দেশে ফেরার জন্য যাবতীয় খরচ বহন করবে দেশটির সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘কুয়েত সরকার যখনই চাইবে আমরা তাঁদের নিয়ে আসব। কুয়েত সরকার ১৯০ জনের তালিকা পাঠিয়েছিল। আমরা সম্মতি দিয়েছি। ১৪৪ জন ফিরেছেন। এয়ারলাইনস চালু হলে যখনই ফ্লাইট শিডিউল দেবে তখনই সবাইকে আমরা নিয়ে আসব।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই কোনো কোনো বিশেষ ফ্লাইটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত আসছেন। এঁদের কারো কারো পাসপোর্ট আছে, তবে অনেকেই আউট পাস নিয়ে দেশে আসছেন। ওমান ও কুয়েত থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁরা কারাগারে ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাগজে সেটা লেখা আছে।’ তিনি বলেন, ‘যাঁদের কভিড-১৯ নেতিবাচক সনদ আছে তাঁদের আমরা ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর যাঁদের কোনো লক্ষণ আছে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হচ্ছে।’

ডা. শাহরিয়ার জানান, একসঙ্গে অনেকে চলে আসার কারণে চাপ সামলাতে নানা সংকটে পড়তে হচ্ছে। তাঁর দুজন সহকর্মীও প্রবাসফেরতদের স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা