kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

সন্দেহ হলেই ‘লকডাউন’

বেড়েছে নমুনা সংগ্রহের গতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সন্দেহ হলেই ‘লকডাউন’

দেশের যেখানেই করোনা সন্দেহ, সেই এলাকা ‘লকডাউন’ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মানুষের মনে করোনাভীতি আরো দানা বাঁধছে। মানিকগঞ্জের সিংগাইরে দুজন, শেরপুরে দুজন, সিলেট, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জে একজন করে করোনায় আক্রান্তের খবর চাউর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। করোনা উপসর্গ দেখা দিলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে কাছাকাছি পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়াও নতুন গতি পেয়েছে।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে নারী সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকসহ দুজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সেকেন্দার আলী মোল্লা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের ওই সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক (৪৫) থাকেন রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগে। গত ২৬ মার্চের পর অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি আর অফিসে যাননি। গত শনিবার ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করলে ফল পজিটিভ আসে। পর তাঁকে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে পাঠনো হয়।

এদিকে গত শনিবার রাতে তাবলিগ জামাতের এক মুসল্লি (৬০) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর করোনা শনাক্ত হওয়ার পর সিংগাইর পৌরসভা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দার মধ্য কাইচাইল গ্রামে। ১৩ সদস্যের তাবলিগ জামাতের একটি দলের সঙ্গে তিনি গত ২৪ মার্চ থেকে পৌর এলাকার একটি মসজিদে অবস্থান করছিলেন। গত শুক্রবার রাতে আইইডিসিআরে তাঁর নমুনা পরীক্ষা করা হলে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়।

শেরপুরের শ্রীবরদী ও সদর উপজেলায় দুই নারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল রবিবার বিকেলে ওই দুই নারীর নমুনা পরীক্ষার ফলে কভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আনওয়ারুর রউফ। করোনায় আক্রান্ত ওই দুই রোগীর একজন শ্রীবরদী শহরের সাতানি শ্রীবরদী এলাকার বাসিন্দা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়া হিসেবে কর্মরত। অন্যজন শেরপুর সদরের লছমনপুর এলাকার এক গৃহবধূ। করোনা আক্রান্ত ওই দুই নারীকে রাতেই জেলা হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দুই নারীর বাড়ি এবং আশপাশের এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে গতকাল বিকেলে এক কিশোরের (১৫) নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক ব্যক্তি (৬৮) করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি জিনজিরা ইউনিয়নের মডেল টাউন এলাকার বাসিন্দা। তাঁর আক্রান্তের ঘটনায় পুরো মডেল টাউন এলাকা লকডাউন করে দিয়েছে প্রশাসন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মোবারক আলী জানান, বর্তমানে চিকিৎসার জন্য তাঁকে কুয়েত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিবারকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লামাপাড়ায় আরো এক ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ঢাকার বাসিন্দা। গত শনিবার ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকায় মেয়ের বাড়িতে আসেন তিনি। এ খবরে বাড়িটিসহ মোট ২০৮ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত শনিবার যে দুজন মারা গেছে, তাদের মধ্যে একজনের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ায়। ৯০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির মৃত্যুর খবরে স্থানীয় প্রশাসন হাটুবাজার এলাকার ৩৫টি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছে। হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে ওই সব বাড়ির ২০২ জনকে। এদিকে নড়িয়ায় করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকায় ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন। গত শনিবার রাত থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সব গ্রামে গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হচ্ছে। স্থানীয় জনসাধারণকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

সিলেটে একজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ওই চিকিৎসক বর্তমানে নিজ বাসায় আছেন। এর আগে তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছিল। গতকাল রাতে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আক্রান্ত চিকিৎসকের বাসাটি এরই মধ্যে লকডাউন করা হয়েছে। এদিকে সিলেট বিভাগের চার জেলা থেকে গতকাল রবিবার ৬৬ জনের নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এগুলোর ফল জানা যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান জানান, সিলেটের চার জেলা থেকে ৬৪ ব্যক্তির শরীরের প্রয়োজনীয় নমুনা আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের ১৬ জন, সুনামগঞ্জের ১৪ জন, মৌলভীবাজারের ১৪ জন ও হবিগঞ্জের ২০ জনের নমুনা রয়েছে। এ ছাড়া সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে থাকা দুই নারীর প্রয়োজনীয় নমুনাও পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে করোনা পরীক্ষার জন্য বিশেষ ল্যাব স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে এই ল্যাবে করোনা পরীক্ষা শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে সাতজনকে আইসোলেশন বেডে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের রক্তের নমুনা ঢাকায় আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে।

বগুড়ার ধুনটের কালেরপাড়া ইউনিয়নের হেউটনগর গ্রামে মালয়েশিয়াপ্রবাসীর ছেলে পোশাক কারখানার এক কর্মীর বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। এ নিয়ে ওই উপজেলার চারটি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করা হলো।

টাঙ্গাইলে ৩০ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ছয়জনের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। তাদের কারোর মধ্যেই করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইলে গতকাল পর্যন্ত পাঁচজনকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

করোনার উপসর্গ নিয়ে এক ব্যক্তি (৩৫) গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত জেলায় ১৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো নমুনার প্রতিবেদন হাতে আসেনি।

হবিগঞ্জ থেকে ২১ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো নমুনার প্রতিবেদন আসেনি। এর আগে হবিগঞ্জ থেকে ১১টি নমুনা পাঠানো হলেও কোনোটিতেই করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। করোনার উপসর্গ থাকায় মাগুরা থেকে গতকাল পর্যন্ত পাঁচজনের নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

ঝালকাঠির নলছিটিতে করোনা সন্দেহে এক ব্যক্তিকে (৪৭) গতকাল দুপুরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিরা]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা