kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

সবজি ‘পচছে’ বাজারে, ক্ষেতেও

বেগুন করলা শসার কেজি ২ টাকা পাইকারি ক্রেতার সংকট

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সবজি ‘পচছে’ বাজারে, ক্ষেতেও

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বাউরা ইউনিয়নের নবীনগরের কৃষক নূর মোহাম্মদের সবজিক্ষেত। এই সবজি আদৌ বিক্রি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চিন্তিত তাঁর মতো অনেক কৃষক। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে ‘পানির দরে’ বিক্রি হচ্ছে সবজি। আবার বিক্রি করতে না পারায় শাকসবজি ক্ষেতে নষ্টও হচ্ছে। জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বেগুন মাত্র দুই টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর এক কেজি করলার মূল্য কুড়িগ্রামে পাঁচ টাকা হলেও জয়পুরহাটে দুই টাকা। অন্য সবজির মূল্যও খুবই কম। এতে বিপাকে পড়েছেন চাষি-কৃষকরা। লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের। বাজারে বিশেষ করে পাইকারি ক্রেতা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে খুচরা বাজারে সবজির দাম এর কয়েক গুণ।

জয়পুরহাটে পাইকারি ক্রেতা না থাকায় এক মণ করলা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০ টাকায়। অথচ ১০-১৫ দিন আগে এর দাম ছিল ৪০০ টাকা। গত শনিবার সকালে জয়পুরহাট পৌর সদরের নতুনহাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ভ্যানে করে করলা, বেগুন, টমেটো ও ক্ষীরা নিয়ে এসেছেন বিক্রির জন্য। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় হাটে পাইকারি ক্রেতারা আসতে পারেননি। শুধু কয়েকজন খুচরা ক্রেতা দরদাম করছেন। জয়পুরহাট সদর উপজেলার ধারকী চৌধুরীপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, তিনি সাড়ে চার মণ করলা বিক্রি করতে সকাল থেকে বসে আছেন। কিন্তু ক্রেতা নেই। একই গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘চার মণ করলা বিক্রির জন্য এনেছি। প্রতি মণের দাম করছে মাত্র ৮০ টাকা। অথচ ২০ শতক জমিতে করলা চাষ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকার। এখন বাজারের যে অবস্থা তাতে লোকসানে পড়তে হবে।’ ক্ষেতলাল উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমীন বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে বেগুন ও করলা চাষ করেছি। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। বেগুন ও করলা দুটোই ভালো হয়েছে। কিন্তু একেবারেই দাম পাচ্ছি না। বেগুন ৮০ টাকা মণের বেশি বিক্রি হচ্ছে না। আর করলা প্রথম প্রথম ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এখন কেউ দামই করছে না।’

সদর উপজেলার কড়ই গ্রামের কৃষক সারওয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদনের পর বিক্রি করতে গেলে আর দাম পাই না। অথচ আমাদের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ টাকা কেজি দরে বেগুন, করলা বা অন্যান্য ফসল কিনে নিয়ে ব্যবসায়ীরা ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন।’ চক গ্রামের কৃষক হোসেন আলী বলেন, ‘পৌনে এক বিঘা জমিতে ছয় হাজার টাকা খরচে ক্ষীরা চাষ করে বিক্রি করেছি মাত্র আড়াই হাজার টাকা। প্রতি মণ ক্ষীরা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ফসলের দাম এভাবে কমতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’ গতকাল রবিবারও পাইকারি বাজারে এমন দামে সবজি বিক্রি হয়।

জয়পুরহাট শহরের শান্তিনগর গ্রামের চাকরিজীবী মাসুদ রানা পাইকারি বাজারে করলার দাম শুনে হতবাক হয়ে বলেন, শনিবার বাজার থেকে তিনি করলা কিনেছেন ২০ টাকা এবং বেগুন কিনেছেন ১০ টাকা কেজি দরে। তিনি বলেন, কৃষকরা কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করে লাভ করতে না পারলেও শুধু হাত বদল করে কয়েক গুণ বেশি লাভ করছেন ব্যবসায়ীরা।

জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘লাভ বেশি পাওয়ার কারণেই এ জেলায় কৃষকরা সবজি চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। জেলায় এ বছর সবজি চাষ হয়েছে এক হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে। করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। আমরা আশা করছি এ অবস্থা কেটে গেলেই কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য ফিরে পাবেন।’

কুড়িগ্রামে এখন প্রতিটি লাউ চার টাকা আর বেগুন ও শসা দেড়-দুই টাকা এবং করলা পাঁচ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা। তা-ও ক্রেতা না পাওয়ায় ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে সবজি। তবে খুচরা বাজারে দামের তারতম্য রয়েছে অনেক।

সদর উপজেলার হলোখানা ও কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের সবজিচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রেতাসংকটের কারণে বেশির ভাগ সবজির দাম কমে গেছে। হলোখানার সন্ন্যাসী গ্রামের চাষি মো. ফারুক মিয়া জানান, তিনি লিজ নিয়ে প্রায় তিন বিঘা জমিতে লাউ, বেগুন, শিম, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ করেছেন। বর্তমানে বেগুন ও লাউ ক্ষেত থেকে তুলে হাটে নিয়ে গেলে বিক্রি করে খরচ ওঠে না। তাই ক্ষেতেই পড়ে আছে সবজি। এরই মধ্যে লাউক্ষেতের অর্ধেক ভেঙে ফেলেছেন তিনি। একই গ্রামের শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি ৩০ শতক জমিতে শসা চাষ করেছেন। খরচ পড়েছে ৪০ হাজার টাকা। অথচ এ পর্যন্ত মাত্র দুই হাজার টাকার শসা বিক্রি করেছেন। বর্তমানে শসার দর ৬০-৭০ টাকা মণ। স্থানীয় ক্রেতা নেই। বাইরের ক্রেতারাও আসছেন না।

কাঁঠালবাড়ীর শিবরাম গ্রামের কৃষক ওয়াহেদ আলী জানান, অনেক খরচ করে চরে করলা আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন তিনি। হাটে এনে ২০০-২৫০ টাকা মণ দরে করলা বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে করলা মাঠ থেকে তোলার খরচই উঠছে না। তবে খুচরা বাজারে এখনো অনেক সবজির দাম বেশি বলে জানিয়েছেন একাধিক ক্রেতা। কুড়িগ্রাম জিয়া বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান আলী জানান, খুচরা বিক্রেতারা না আসায় সবজির চাহিদা কমে গেছে। ফলে মোকামে চাহিদা না থাকায় কৃষক পর্যায়ে সবজির দাম পড়ে গেছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে কি না সন্দেহ। 

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গতকাল গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকের জমিতে পড়ে রয়েছে শাকসবজি। অনেকের ক্ষেতেই এসব নষ্ট হচ্ছে। পাইকারি ক্রেতা না থাকায় ও দাম কম হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাউরা ইউনিয়নের নবীনগর গ্রামের কৃষক মো. ইমান হোসেন (৩৬) ও নুর মোহাম্মাদ (৩২) বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে শাকসবজির দাম পানির মতো হয়ে গেছে। প্রতি কেজি শসা পাঁচ টাকা, বেগুন দুই টাকা ও পুঁইশাক ছয় টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁধাকপি প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে দুই টাকায়। এ অবস্থা আর কিছুদিন চললে তাঁদের ব্যাপক ক্ষতি হবে।

পাটগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল গাফ্ফার জানান, উপজেলায় এ বছর ৮৭০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন বেশি হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে কৃষকরা সবজির দাম কিছুটা কম পাচ্ছেন।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম ও পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা