kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

হাসপাতালে চরম অসহযোগিতা, এলাকায় বৈরিতা

এক কাশিতে সব ওলটপালট!

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারায়ণগঞ্জের বন্দরের রসুলবাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী এক নারীর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ ব্রেনস্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও পরে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে কভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়েছে। গতকাল শনিবার সামাজিক মাধ্যম ইমোতে পরীক্ষার রিপোর্ট দেখিয়ে মৃত নারীর ছেলে পাভেল বলেন, ‘মা শুধু একটি কাশি দিয়েছিল। এক কাশির অপরাধে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি নেওয়া হলো না। কুর্মিটোলায় যখন গেলাম, কোনো ডাক্তার নেই। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা মায়ের চিকিৎসায় কাকুতি-মিনতি করেছি। একটু ছুঁয়েও দেখেনি কেউ। মাকে ধরার জন্য সামান্য একটু হেক্সিসল চেয়েছিলাম, তাও দেয়নি। ভর্তি নেওয়ার পর একজন ওয়ার্ড বয় বা নার্স এগিয়ে আসেনি রোগীকে খাটে তোলায় সাহায্য করতে। তাই হুইলচেয়ারে বসেই আমার মা মারা যায়। মরে যাওয়ার পর ডাক্তারের অভাব নেই। মৃত্যু সনদে লেখা ছিল মৃত্যুর কারণ ব্রেন স্ট্রোক। কিন্তু মৃত্যুর দুই দিন পর ধরা পড়ল করোনা। এবার আপনারাই বলেন ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যাওয়া মাকে কি জানাজা দেব না!’ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনভুক্ত বন্দর উপজেলার রসুলবাগ এলাকায় করোনায় মৃত নারীর ছেলে মোহাম্মদ পাভেল চরম আক্ষেপে ভেঙে পড়ে গতকাল শনিবার এই প্রতিবেদককে মোবাইল ফোনে হৃদয় নিংড়ানো এসব কথা বলেন।

তিনি ইমোতে করোনায় মৃত মা পুতুল বেগমের (৫০) ডেথ সার্টিফিকেটের কপি সরবরাহ করে বলেন, ‘দেখেন। কুর্মিটোলা থেকেই আমার মা যে ব্রেন স্ট্রোকে মারা গেছে তা লিখে দিয়েছে।’ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত এই যুবক আরো বলেন, ‘আমাদের বাড়িসহ এলাকার ১০০ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। বাড়ির সামনে এসে রাতের আঁধারে চিৎকার করে কে বা কারা প্রতিদিন হুমকি দিচ্ছে, তোদের একটা একটা করে মেরে ফেলব। কারণ আমরা নাকি করোনায় মৃত আমার মায়ের জানাজা দিয়েছি। কিন্তু আমরা তো মাকে করোনা রোগী হিসেবে জানাজা দেই নাই। দিয়েছি ব্রেন স্ট্রোকের রোগী হিসেবে।’

মা পুতুলের চিকিৎসা নিয়ে হয়রানির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে পাভেল বলেন, “আমার মা পুতুল দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন। গত ২৯ মার্চ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে তাঁকে নারায়ণগঞ্জ খানপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কোনো চিকিৎসা হয়নি। পরে শহরের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে আমাদের পরিচিত থাকায় ডাক্তার কিছু টেস্ট দেয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। দায়িত্বরত ডাক্তার রোগের কথা শুনে ভর্তি নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু একটি কাশি সব ওলটপালট করে দেয়। বাইরে থাকা রোগী আমার মা একটি কাশি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বলে দেন, উনাকে ভর্তি নেওয়া যাবে না। তাঁকে কুর্মিটোলায় নিয়ে যান। আমরা কী করব ভেবে না পেয়ে মাকে ফের নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসি। কিন্তু মায়ের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। ৩০ মার্চ দুপুরের দিকে নারায়ণগঞ্জের সব ক্লিনিক ও হাসপাতালে যোগাযোগ করি কিন্তু কোথাও ডাক্তার নেই। পরে দুপুর ১টায় কুর্মিটোলা নিয়ে যাই। সেখানে নার্সরা কেউ ছুঁয়েও দেখেনি রোগীকে। কোনো ডাক্তার ছিল না। এ সময় নার্সরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল আর হাসছিল। পরে আমি চিৎকার করলে তারা ভর্তি নেয়। কিন্তু আমি মাকে ধরার জন্য একটু হেক্সিসল দিতে বললে নার্সরা বলে দেয়, এগুলো সরকারি। দেওয়া যাবে না। মায়ের ওজন একটু বেশি ছিল। আমি ও আমার স্ত্রী অসুস্থ মাকে আর বেডে তুলতে পারছিলাম না। সাহায্যের জন্য নার্সদের ডাকলাম, কেউ কাছে আসেনি। ওই সময় পাশের বেডের রোগীর সঙ্গে আসা যুবক ছেলে বললেন, ‘আমি এখানে পাঁচ দিনেও কোনো ডাক্তার দেখিনি।’ আমি বাইরে গিয়ে অনেক প্রতিবাদ করার পরে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসে নার্সরা। কিন্তু অক্সিজেন সরবরাহ পাইপে কোনো মাস্ক ছিল না। বাধ্য হয়ে মাকে শুধু পাইপ দিয়ে অক্সিজেন দিই। ধীরে ধীরে তাঁর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। একপর্যায়ে মা মারা যান। এর আগে মায়ের চিকিৎসার অবহেলা দেখে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি—আমার মাকে ছেড়ে দেন চলে যাব। কিন্তু নার্সরা তখন বলছিল এখানে থাকলে ১৪ দিন পর ছাড়া আর বের হতে পারবেন না।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা