kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ আষাঢ় ১৪২৭। ৯ জুলাই ২০২০। ১৭ জিলকদ ১৪৪১

রাজধানীতে ত্রাণ বিতরণ

পুলিশের নির্দেশনার পরও থামেনি বিশৃঙ্খলা

জহিরুল ইসলাম ও তানজিদ বসুনিয়া   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজধানীতে ত্রাণ বিতরণে বৈষম্য দূর হয়নি। রাজধানীতে যেকোনো প্রকার ত্রাণ ও সেবা বিতরণ করার আগে পুলিশ প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশনা জারির পরও দূর হয়নি সেবা ও ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতা। ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা কমাতে সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েই গেছে। কিছু এলাকায় সাহায্যপ্রার্থীরা বেশি পরিমাণে ত্রাণ ও আর্থিক সাহায্য পাচ্ছে, এর বাইরের এলাকাগুলোয় স্বল্প পরিমাণে সাহায্য মিলছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর পুরান ঢাকা, মহাখালী, বনানী ও কুড়িল এলাকায় গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক প্রেস নোটে ত্রাণ ও সেবা বিতরণ করার আগে পুলিশ প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশনা জারি করা হয়। কিন্তু উল্লেখিত এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন অনেকে। ত্রাণ দেওয়ার খবর পেলেই সব কিছু ভুলে ভিড় করে জটলা পাকাচ্ছে মানুষ।

শনিবার রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার ফুটপাতে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করে একটি খাবারের প্যাকেট ও ২৩০ টাকা সাহায্য পেয়েছেন শাহিনা আক্তার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “সকাল থেকে দাঁড়াইছি। পুলিশের একটা লোক এসে এক প্যাকেট খাবার দিয়া গেছে। আর প্রাইভেট কারে একজন ‘স্যার’ যাওয়ার সময় আমি ও আমার পাশে থাকা অন্য চারজনসহ মোট পাঁচজনরে এক হাজার টাকা দিয়া গেছেন। পরশু দিন (গত বৃহস্পতিবার) এক স্যারে আমারে ৫০০ টাকা দিছিলেন।” বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ী সড়কের পাশে ত্রাণের অপেক্ষারত আব্দুস সালাম জানান, ‘সকাল থেকে দাঁড়ায়া দুই প্যাকেট খাবার, চাল-ডালের একটি মাঝারি ব্যাগ ও কিছু টাকা পাইছি। এইহানে প্রত্যেক দিন স্যারেরা ত্রাণ দিয়া যায়।’

গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে আজিমপুরের শেখ সাহেব বাজারের ৩৪ নম্বর বাসার গেটের সামনে দাঁড়ানো এক নারী নীরবে ত্রাণ দিচ্ছিলেন রিকশাচালক ও দুস্থদের। চুপিসারে ত্রাণ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী বলেন, ‘আসলে বাইরে যাওয়া নিরাপদ মনে করছি না। আবার নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্টের চিত্র দেখে নিজেকে ঘরবন্দিও রাখতে পারছি না। তাই মুখে মাস্ক এবং হাতমোজা পরে সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করছি।’ ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে বেশি বিশৃঙ্খলা দেখা যায় রাজধানীর পুরান ঢাকায়। কোনো গাড়ি এসে দাঁড়াতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে রাস্তার পাশে ফুটপাতে থাকা মানুষ। গতকাল দুপুরে আজিমপুর মোড়ে একটি ভ্যানগাড়িতে করে চাল, ডাল আর পেঁয়াজের প্যাকেট নিয়ে কয়েকজন এলে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের ফুটপাতে থাকা নারী-পুরুষ এবং রাস্তায় থাকা রিকশাচালকরা এসে ভিড় জমাতে থাকে। ৩০-৪০ প্যাকেট ত্রাণের বিপরীতে মুহূর্তে মানুষ বাড়তে থাকে। কয়েক মিনিটেই শেষ ত্রাণ বিতরণ। এ সময় কারো মধ্যে সামাজিক বা ব্যক্তিগত দূরত্বের লেশমাত্র দেখা যায়নি। তবে পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এসে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সবাইকে অনুরোধ করছিলেন। ত্রাণ বিতরণে আসা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই অল্প করে যতটা পেরেছি নিয়ে এসেছিলাম। তাই পুলিশকে জানাইনি। এমন হবে ভাবতে পারিনি।’ একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর মহাখালী এলাকাতেও। মহাখালী মোড় ও আমতলীতে গতকাল শনিবার ত্রাণের জন্য শ খানেক মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কেউ সাহায্য দিতে এলে সঙ্গে সঙ্গেই জড়ো হচ্ছে ফুটপাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ত্রাণপ্রত্যাশীরা। গতকাল শনিবার দুপুর ২টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোতে কয়েকজন এসে খাবারের প্যাকেট বিতরণ শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ উপস্থিত হয়। এই বিশৃঙ্খলা দেখে ২০টির মতো প্যাকেট বিতরণ করেই সেখান থেকে চলে যায় মাইক্রোটি। সেই খাবারের প্যাকেট পাওয়াদের একজন রাবেয়া খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্যারেরা সবাইরেই প্যাকেট দিতে চাইছে; কিন্তু আমরাই ভালা না। একজন একজন কইরা লাইনে আইলে সবাই পাইত।’

ত্রাণ বিতরণের আগে স্থানীয় পুলিশ প্রসাশনকে জানানো হচ্ছে কি না, এ সম্পর্কে লালবাগ থানার ওসি এম আশরাফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা জানাচ্ছে আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করছি। যারা জানাচ্ছে না তাদেরও ত্রাণ বিতরণের খবর পেয়ে সহায়তা করা হচ্ছে, যাতে সামাজিক এবং ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখে। কিছুটা বিশৃঙ্খলা তো আছেই। আসলে পুরান ঢাকায় বেশির ভাগ ত্রাণই দিচ্ছে চলন্ত গাড়িতে। তাই মানুষের অল্প উপস্থিতিতেও ঝামেলা দেখায়।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসীরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা আগে থেকে আমাদের জানাচ্ছেন। তবে লোকালি যাঁরা ত্রাণ বিতরণ করছেন তাঁরা অনেকেই জানাচ্ছেন না। আসলে অনেক মহিলা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশে বসে থাকে ত্রাণের আশায়। আমরা তাদের এভাবে বসে থাকতে নিরুৎসাহিত করছি। সেই সঙ্গে রাস্তায় ত্রাণ বিতরণ না করতে সবাইকে বারবার বলছি। এর পরও কিছু বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা