kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

ভাড়াটিয়ারা মহা উৎকণ্ঠায়

আশরাফ-উল-আলম ও জহিরুল ইসলাম   

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাড়াটিয়ারা মহা উৎকণ্ঠায়

মার্চ মাস শেষে বর্তমানে চলছে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। রীতি অনুসারে মাসের এই শুরুর সপ্তাহেই বাড়িওয়ালাদের মাসের ভাড়া বুঝিয়ে দিতে হয় ভাড়াটিয়াদের। কিন্তু এখন স্বাভাবিক সময় নয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মানুষের সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি। এই ছুটি আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ছুটি আরো দীর্ঘ হবে কি না, তা নির্ভর করছে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের গতি-প্রকৃতির ওপর। সরকারের সাধারণ ছুটির আওতায় বেশির ভাগ দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ। খেটে খাওয়া মানুষের কাজ নেই। ফলে বাড়িভাড়ার বিষয়টি ভাড়াটিয়াদের জন্য ভীষণ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহা উৎকণ্ঠায় পড়েছেন তাঁরা।

এই চিত্র শুধু ঢাকা শহরের নয়। দেশের অন্য শহরগুলোতেও লাখ লাখ মানুষ বাসা ভাড়া করে বসবাস করে। বেশির ভাগ ভাড়াটিয়ারই সীমিত আয়। এই আয়ে টান পড়লে জীবনধারণসহ বাড়িভাড়া পরিশোধ কষ্টকর হয়ে পড়ে। বর্তমানে চলছে বৈশ্বিক মহামারি। এ পরিস্থিতিতে আপনজনদের সঙ্গেও দেখা করার উপায় নেই। সব মিলিয়ে বাড়িভাড়া পরিশোধের মতো আর্থিক বিষয়টি কিভাবে সামাল দেবেন ভাড়াটিয়ারা, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় সবাই।

বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও বর্তমানে অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করছে। একদিকে অদৃশ্য ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। এ আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজন আর্থিক সংগতি; কিন্তু মানুষ এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে। সব মিলিয়ে লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে কম আয়ের মানুষ।

এই অপ্রত্যাশিত বৈশ্বিক মহামারিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বেশ কিছু বাড়িওয়ালা পাশে দাঁড়িয়েছেন ভাড়াটিয়াদের। তাঁদের কেউ এক মাসের, কেউ বা দুই মাসের বাড়িভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের এই আতঙ্কিত সময়ে অভিনয়শিল্পী ভাবনার পরিবার রাজধানীর হাজারীবাগে তাঁদের ছয়তলা বাড়ির সব ভাড়াটিয়ার বাড়িভাড়া মওকুফ করে দিয়েছে। আর রাজধানীর জুরাইনে দারোগাবাড়ির ১ নম্বর সড়কের বাড়ির মালিক শেখ শিউলী হাবিবও তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করায় বাংলাদেশে সব কিছু স্থবির হয়ে পড়েছে। কর্মজীবী মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। তাই আমি এ দেশের একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেবে আমার বাড়ির সব ভাড়াটিয়ার মার্চ মাসের ভাড়া মওকুফ করে দিলাম।’

এভাবে আরো কিছু বাড়িওয়ালা এগিয়ে এসেছেন মানবতার পাশে। মহিব রহমান নামে এক বাড়িওয়ালা তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়াদের দুই মাসের ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছেন। হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ এলাকায় তাঁর বাড়ি। সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি থাকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সংবাদগুলো প্রচার হতে থাকলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, পিরোজপুর, সিলেটের বেশ কয়েকজন বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সবার উদ্যোগ তো এক নয়। অনেক বাড়িওয়ালা এমন পরিস্থিতিতে আগে থেকেই ভাড়ার জন্য তাড়া দিতে শুরু করেছেন। করোনা পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হয়, ভবিষ্যতে যদি ভাড়া দিতে না পারে এসব ভেবে অনেক বাড়িওয়ালা চাচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা বাসা ছেড়ে দিক।

রাজধানীর ভাড়াটিয়াদের সংগঠন ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান খান রচি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। মানুষের কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ। আয় নেই। এ অবস্থায় বাড়িওয়ালাদের ভাড়াটিয়াদের পাশে থাকা মানবিক দায়িত্ব। প্রত্যেক বাড়িওয়ালার উচিত অন্তত দুই মাসের ভাড়া মওকুফ করে দেওয়া।’

তিনি আরো বলেন, ‘অনেক বাড়িওয়ালা ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের দেখে অন্য বাড়িওয়ালারাও এ কাজটি করতে পারেন। যদি না করেন, তাহলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে মহা বেকায়দায় পড়বে অধিকাংশ মানুষ।’

মোহাম্মদ মামুন মিয়া, উবারের গাড়ি চালান। থাকেন মোহাম্মদপুরে। তিনি বলেন, ‘এক টাকাও রোজগার নেই। বাড়িভাড়া কিভাবে দেব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। সরকার এগিয়ে না এলে আমার মতো অনেকেই আছেন, ঢাকার বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হবে। বেকার হয়ে যাব আমরা।’

পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করেন আবদুর রহিম। আদালতপাড়ার পাশেই একটি মেসবাড়িতে থাকেন। বর্তমানে আদালত বন্ধ থাকায় তাঁর আয়-রোজগারও বন্ধ। তিনি বলেন, ‘ভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এক দুই মাস ভাড়া দিতে না পারলে বাড়ি ছাড়তে হবে। বাড়ি ছাড়তে না হলেও বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দিতে হবে। বাকি পড়ে গেলে কিভাবে দেব, খুব চিন্তায় আছি!’

চকবাজার এলাকার চক সার্কুলার রোডে নিজের স্যান্ডেলের দোকানের সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে ছিলেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ভাই দোকান ভাড়া ১২ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া ১০ হাজার। পরিবার গ্রামে পাঠাইলেও ভাড়া তো আর মালিকরা মাফ করবে না। এমন অবস্থায় কী করমু, কিছু বুঝতে পারতাছি না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা