kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

পাহাড়ের আরো ২০ শিশু হাসপাতালে

খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি   

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাহাড়ের আরো ২০ শিশু হাসপাতালে

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় হামের লক্ষণ থাকা আরো ২০ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাদের। তাদের সবাই দীঘিনালার রথীচন্দ্র কার্বারীপাড়ার বাসিন্দা। এর আগে গত শনিবার হামে আক্রান্ত হয়ে একই এলাকার ধ্বনিকা ত্রিপুরা নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

এদিকে কুসংস্কারের কারণেই অনেক অভিভাবক সন্তানদের হামের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

গতকাল পর্যন্ত মোট ২১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একজনকে ভর্তি করা হয় গত রবিবার। বাকি ২০ জনকে ভর্তি করা হয় গতকাল। এর মধ্যে সকালে নেওয়া হয় আট শিশুকে; বিকেলে ভর্তি করা হয় আরো ১২ শিশুকে। রথীচন্দ্র কার্বারীপাড়ায় আক্রান্ত শিশু ও স্বজনদের হাসপাতালে নেওয়ার গাড়ি এবং খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জোনের মেডিক্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন আহসান হাবিব নোমান।

দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তনয় তালুকদার জানান, হামে আক্রান্ত এলাকায় গিয়ে আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে প্রতি ঘরে তল্লাশি চালানো হবে। এরপর আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। দেওয়া হবে হামের টিকাও।

ভাইবোনছড়ায় অনেকে আক্রান্ত : জেলা সদরের ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে হামের প্রকোপ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরিমল ত্রিপুরা। তিনি জানান, ইউনিয়নের নবকুমার কার্বারীপাড়া, শ্যামবাড়িপাড়া, আলমনিপাড়া, রবিধনপাড়া, সুধন্য কার্বারীপাড়া ও ভেজাচন্দ্র কার্বারীপাড়ায় অর্ধশতাধিক শিশুর শরীরে জ্বর, কাশি ও শরীরে লাল লাল দাগ দেখা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন নূপুর কান্তি দাশ বলেন, কয়েক দিন ধরে দুটি মেডিক্যাল টিম এসব গ্রামে কাজ করছে। টিমের সদস্যরা ৮৭ শিশুকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ ধরা পড়েছে। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসায় সেরে উঠছে। এসব এলাকায় চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি।

সিভিল সার্জন জানান, এখানকার শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে মূলত অপুষ্টির কারণে। এ ছাড়া হাসপাতালে যাওয়ার ব্যাপারেও গ্রামবাসীর মধ্যে অনীহা রয়েছে।

কুসংস্কারও দায়ী : উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ত্রিপুরা অধ্যুষিত রথীচন্দ্র কার্বারীপাড়ায় ৮৪ পরিবারের বাস। স্থানীয় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধ্বনিময় ত্রিপুরা জানান, স্বাস্থ্যকর্মীরা এলেও অনেক অভিভাবকই সন্তানদের টিকা দেওয়ান না। তাঁদের ধারণা, টিকা দিলে শিশুদের জ্বর হবে এবং বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

পাড়াটির শেষ প্রান্তে বাগান চন্দ্র ত্রিপুরার (৫৫) বাড়ি। তাঁর ঘরে ঢুকে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত তিন বোন মেঝেতে শুয়ে আছে। জ্বরও আছে তাদের শরীরে। বাবা বাগান চন্দ্র জানান, ছয় দিন আগে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মেডিক্যাল টিমের লোকজন এসেছিল; কিন্তু তাদের কাছে নেওয়া হয়নি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘একজন হলে নেওয়া যায়। তিনজনকে কিভাবে নিয়ে যাব।’ হাসপাতালে নিচ্ছেন না কেন—এমন প্রশ্নেও একই উত্তর দেন বাগান চন্দ্র।

স্থানীয় বাজার থেকে ওষুধ হাতে ফিরছিলেন তজেন ত্রিপুরা (৩৫)। তিনি জানান, তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে নিপুণ ত্রিপুরা হামে আক্রান্ত। তিনিও মেডিক্যাল টিমের কাছে ছেলেকে নিয়ে যাননি।

আরেক বাড়িতে হামে আক্রান্ত হয়েছে শিশু শনিতা ত্রিপুরা। তার বাবা বিনর কান্তি ত্রিপুরা (৪৫) জানান, এলাকার অনেকের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে। অনেকেই মনে করছে, শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে করোনাভাইরাস হয়েছে ভেবে শিশুদের গুম করে ফেলা হবে। গুলি করে মেরেও ফেলতে পারে। এমনকি গত রবিবার পান্থই ত্রিপুরা নামের এক শিশুকে যখন মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনো তার পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছিল। কিন্তু সোমবার সকালে যখন এলাকায় খবর যায় যে পান্থই অনেকটা সুস্থ তখন স্থানীয় লোকজনের আতঙ্ক কিছুটা কমতে শুরু করে।

 

হামের প্রকোপ

চিকিৎসাসেবা দিল সেনাবাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছে সেনাবাহিনী। আইএসপিআর জানায়, রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম শিয়ালদহ এলাকায় সম্প্রতি হাম রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক দিনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে সাজেকের তিনটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার আট ত্রিপুরা শিশু প্রাণ হারায়। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব এলাকায় চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য বেসামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ  থেকে অনুরোধ করা হলে গত ২৪ মার্চ সামরিক ও বেসামরিক চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি চিকিৎসকদলকে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে শিয়ালদহ এলাকায় পাঠায় সেনাবাহিনী। চিকিৎসকদলটি গত ২৪ মার্চ  থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত নিরলসভাবে ১৭১ শিশুসহ মোট ২০২ জন রোগীকে চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা  দেয়।

এ ছাড়া ওই এলাকায় একই পরিবারের অপুষ্টিজনিত রোগসহ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত পাঁচ শিশুকে গত ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে আক্রান্ত শিশুরা সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত রয়েছে। এ চিকিৎসা সহায়তার মাধ্যমে ওই এলাকায় সেনাবাহিনী সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা