kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

রাতভর আকুতি, করোনা আতঙ্ক, অবশেষে মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাতভর আকুতি, করোনা আতঙ্ক, অবশেষে মৃত্যু

প্রচণ্ড জ্বরে নিস্তেজ, হাসপাতালে নিতে পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে সাড়া না পাওয়া, অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য ফোন, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ আর বিভিন্ন হটলাইনে ফোন করে ব্যর্থ হওয়া—এসব কিছু এখন অতীত, মারা গেছেন বগুড়ার শিবগঞ্জের এক ব্যক্তি (৪৫)। যাঁর পাশে সারা রাত জেগে ছিলেন অসহায় স্ত্রী-সন্তান। গাজীপুরে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি শিবগঞ্জে আসেন। ওই ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত—এমন আতঙ্কে কেউ তাঁর পরিবারের আকুতিতে সাড়া দেয়নি।

গত শুক্রবার রাতে ওই ব্যক্তির অবস্থার অবনতি হয়। গতকাল শনিবার দুপুরে একজন চিকিৎসক গিয়ে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল। এ ঘটনার পর এলাকার ১০টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

গতকাল বিকেলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই ব্যক্তির মরদেহ দাফন করা সম্ভব হয়নি। ময়দানহাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রূপম শেখ জানান, এলাকার সোবাহানপুর নামক একটি স্থানে ওই ব্যক্তির মরদেহ দাফন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় সেটি সম্ভব হয়নি। পরে পাশের পলাশবাড়ী নামক আরেকটি ফাঁকা স্থানে দাফনের চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে তিনি জানান।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ওই ব্যক্তি গাজীপুরের কাশিমপুরে ব্যবসা করতেন। তাঁর স্ত্রী বগুড়ার একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করার সূত্রে শিবগঞ্জে থাকেন। তাঁদের বাড়ি কাহালু উপজেলায়। তাঁদের আট বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।

গত ২৪ মার্চ জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন তিনি। এ অবস্থায় গত মঙ্গলবার রাতে তিনি শিবগঞ্জে স্ত্রীর বাসায় চলে আসেন। শুক্রবার সন্ধ্যার পর বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ কিনে সেবন করেন। এরপর রাতে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নিতে পাড়া-প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চান স্ত্রী। কিন্তু করোনা সন্দেহে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। এরপর রাতভর তিনি বিভিন্ন স্থানে ফোন করেও সাহায্য পাননি।

ওই ব্যক্তির স্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য প্রথমে আমি পাড়া-প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চেয়েছি। কিন্তু করোনা আক্রান্ত সন্দেহে কেউ এগিয়ে আসেননি। এরপর আমি অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করি জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কাছে। কিন্তু সারা রাত ধরে চেষ্টা করার পরও কোথাও থেকে কোনো সাড়া পাইনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি রাতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হটলাইনে ফোন দিয়েও কাউকে পাইনি। রাতে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের হটলাইনে ফোন করেছি, কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করেনি।’

ওই নারী বলেন, ‘দেখছি বলার বেশি কেউ কিছু করেননি। ছোট একটা মেয়েকে নিয়ে ঘরে নিস্তেজ মানুষটার পাশে বসে ছিলাম সকাল পর্যন্ত, বেঁচে আছে না মরে গেছে, বুঝতে পারিনি।’ তিনি জানান, গতকাল বগুড়ার হটলাইনে ফোন করে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিক আমিন কাজলকে বিষয়টি জানান। তিনি ঘটনাটি বিভিন্ন স্থানে জানানোর পর শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোরতজা আব্দুল হাই শামীম দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন।

ডা. শফিক আমিন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ঢাকায় কথা বলেছি। মৃতদেহ থেকে নমুনা হিসেবে লালা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হবে। পরে রিপোর্ট পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর কবীর জানান, ‘যেহেতু নিহত ব্যক্তি মারা যাওয়ার আগে শরীরে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ ছিল সে কারণে করোনা সন্দেহে ওই বাড়িসহ পার্শ্ববর্তী ১৫টি বাড়িকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা