kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

করোনার বিস্তার

যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই বাড়ির পথে

রফিকুল ইসলাম   

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। জরুরি সেবা খাত সচল রেখে রাজধানী ঢাকা প্রায় ‘লকডাউন’। কিন্তু জনসাধারণের স্থানান্তর রোধে সরকারের নেওয়া এ পদক্ষেপকে ছুটি মওকা হিসেবে নিয়ে নগর ছাড়ছে মানুষ। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়ির পথ ধরেছে। অপ্রতুল গণপরিবহনে জায়গা না পেয়ে অনেকে হেঁটেই রওনা হয়েছে বাড়ির পথে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাওয়ার অন্যতম রুট ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক। এ রুটে গণপরিবহনও চলছে। কিন্তু যাত্রীর ভিড় বেড়ে যাওয়ায় গাড়িতে জায়গা মিলছে না। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলছে বাস, পিকআপ ও ট্রাক। পুলিশ যানবাহন থামিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নামিয়ে দিলেও হেঁটে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আবার যানবাহনে ঠাসাঠাসি করে উঠে গন্তব্যে রওনা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে এক্সপ্রেস রোড ঘুরে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা হওয়া মানুষের মিছিল দেখা গেছে। ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে পরস্পর ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শও মানছে না অনেকে। করোনার সংক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতির চেয়ে যুদ্ধ করে বাড়ি ফেরার তাগিদ সবার মধ্যে।

তথ্য মতে, বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর পোস্তগোলা সেতু থেকে মাওয়া ঘাটের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। গণপরিবহনে যেতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। তবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে কোনো বিরতি ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে লাগে মাত্র আধাঘণ্টা। ঢাকা থেকে পোস্তগোলা সেতু পার হয়ে বাঁ পাশে পড়ে হাসনাবাদ। গতকাল বেলা ২টায় দেখা গেল, সেতুর শেষ মাথায় হাসনাবাদে শতাধিক লোক অপেক্ষা করছে। উদ্দেশ্য, মাওয়া হয়ে বাড়ি ফেরা। হাসনাবাদ পার হয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সামনে এগোতেই দেখা গেল, শত শত মানুষ রাস্তার ধার ধরে মাওয়া অভিমুখে হেঁটে চলেছে। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার সমবয়সীরা দল বেঁধে। পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে গণপরিবহন। প্রতিটিই যাত্রীতে পূর্ণ। ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও না পেয়ে অনেকেই ছাদে চড়ে বসেছে। বাস, পিকআপ, ট্রাকগুলোতে এভাবে চলার পথেই চলছে যাত্রীদের হুল্লোড়। যেন ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে।

নিজের কোলে এক সন্তান, স্ত্রীর কোলে আরেক শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব মাকে নিয়ে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন আকতার হোসেন। হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে কষ্ট স্বীকার করেই মাওয়া অভিমুখে হেঁটে চলেছেন তিনি। বেসরকারি একটি কম্পানির এ চাকুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকায় ঘরবন্দি না থেকে বাড়িতে সবার সঙ্গে সময় কাটানোটাই ভালো মনে করেছি। কিন্তু বাড়ি ফিরতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হলো। বিভিন্ন বাস কাউন্টারে গিয়ে টিকিট পাইনি। এখন মাওয়া পর্যন্ত কোনোক্রমে যেতে পারলে ওপার থেকে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তো মাওয়া পর্যন্ত যাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ কথোপকথন শেষ হওয়ার পরপরই অবশ্য ছোট একটি পিকআপে পরিবারের সবাইকে নিয়ে উঠে পড়ার সুযোগ পেয়ে যান তিনি।

সাব্বির, রহিম, কামাল, ফোরকান ও কাদের—মাওয়ার উদ্দেশে হেঁটে চলেছেন পাঁচ বন্ধু। রাজমিস্ত্রির জোগালি এ পাঁচজনের সবার বাড়িই পিরোজপুরে। রাজধানীর রামপুরায় একটি ছয়তলা ভবনে তাঁরা কাজ করছিলেন। সব কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। তাঁরা জানালেন, এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করে তাঁরা কোনো গাড়ি পাননি। একটি পিকআপে উঠেছিলেন। কিন্তু পথে পুলিশ সেটি থামিয়ে সবাইকে নামিয়ে দিয়েছে। এখন হেঁটেই মাওয়া পর্যন্ত পৌঁছার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শিমুলিয়া ঘাটে হাজারো ঘরমুখো মানুষ

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মাওয়া ঘাটে আটকে পড়েছে ঘরমুখো হাজারো মানুষ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পূর্বঘোষণা ছাড়াই গত মঙ্গলবার দুপুরে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে বিআইডাব্লিউটিএ লঞ্চ ও সি-বোট বন্ধ করে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে জনপ্রতি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় লোকজনকে ট্রলারে করে ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চল অভিমুখী যাত্রীর এ ঢল থামাতে জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার ও পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগরে ব্যারিকেড দিয়ে বাসগুলো ঢাকার দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে প্রশাসন শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ী এলাকায় ফ্লাইওভারের মুখে ব্যারিকেড তৈরি করে। এ সময় ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে থেকে একাধিক যাত্রীবাহী বাস ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা