kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

‘বিদ্যুৎ আপা’ নিলুফা

নিয়ামুল কবীর সজল ও মো. আব্দুল হালিম, ময়মনসিংহ   

৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘বিদ্যুৎ আপা’ নিলুফা

চকরাধাকানাই গ্রামে বিদ্যুতের কাজ করছেন নিলুফা ইয়াসমিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাতে কাজ এলেই আকাশি রঙের গাউন ও হলুদ হেলমেট পরে এবং হাতে সরঞ্জামের ব্যাগ নিয়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে যান তিনি। বাড়ি বাড়ি বিদ্যুতের কাজ করেন। এ থেকে অর্জিত টাকা খরচ করেন সংসারে। পাশাপাশি নিজে লেখাপড়া করেন, সন্তানকে লেখাপড়া করান। ছয় মাস আগেও যে গ্রামের মানুষ তিরস্কার করেছে তাঁকে, তারাই এখন তাঁর কাজের প্রশংসা করে; তাঁকে ‘বিদ্যুৎ আপা নিলুফা’ বলে ডাকে। ২৬ বছর বয়সী নিলুফা ইয়াসমিন পেশায় এখন বিদ্যুৎ মিস্ত্রি (ইলেকট্রিশিয়ান)।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নের চকরাধাকাইন গ্রামের দরিদ্র আব্দুল বারেক বেপারী ও আম্বিয়া খাতুনের মেয়ে নিলুফা ইয়াসমিন। তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। সংসারে অভাবের কারণে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁকে একই গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে দেয় পরিবার। স্বামী তাঁকে নিয়ে ঢাকা চলে যান। লেখাপড়ার আর সুযোগ হয়নি তাঁর। মোস্তাফিজ একটি কম্পানির গাড়িচালক। তাঁর অল্প বেতনের চাকরিতে দুজনের ঢাকায় থাকা-খাওয়া কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই সাত বছর আগে তিন বছরের মেয়ে তাবাসুমকে নিয়ে চকরাধাকানাই গ্রামে বাবার বাড়িতে চলে আসেন নিলুফা। স্বপ্ন দেখেন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার। শুরুটা করেন বাড়ির পাশে এক নারীর কাছে দর্জির কাজ শেখার মধ্য দিয়ে। বাড়িতে ও গ্রামে দর্জির কাজ করে হাতখরচ বের করেন। বাড়ির পাশে বিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করে দেন। তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফুলবাড়িয়া মডার্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে। ২০১৮ সালে এসএসসি পাস করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই এইচএসসিতে ভর্তি হন।

গ্রামে দর্জির তেমন কাজ না থাকায় কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন নিলুফা। পরে তিনি বাড়ির পাশে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি শফিকুল ইসলামের কাছে যান বিদ্যুতের কাজ শিখতে। ময়মনসিংহে বিদ্যুৎ মিস্ত্রির ওপর তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দেন শফিকুল। তবে একজন নারী বিদ্যুৎ মিস্ত্রি হবেন, গ্রামের মানুষ বিষয়টি ভালো চোখে দেখবে না আশঙ্কায় প্রশিক্ষণ নিতে বাধা দেন তাঁর স্বামী। শেষ পর্যন্ত নিলুফা স্বামীকে বুঝিয়ে রাজি করান। ময়মনসিংহে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরইএইচএবি) অধীনে তিন মাসের প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি হন নিলুফা ইয়াসমিন। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে থাকেন তিনি। এ নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য শুরু করে গ্রামের মানুষ। ঢাকায় তাঁর স্বামীর কাছেও নালিশ করে তারা। সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে গত জুলাই মাসে প্রশিক্ষণ শেষ করেন তিনি। এর পর থেকেই বিদ্যুৎ মিস্ত্রির জীবন শুরু নিলুফার। প্রথমে নিজ বাড়ি, পরে আশপাশের বাড়িগুলোতে বিদ্যুতের কাজ করেন। এখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে গিয়ে কাজ করছেন। প্রায় প্রতিদিন কাজে যান, ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। মাঝেমধ্যে আরো বেশি হয় আয়। বাসা-বাড়িতে বিদ্যুতের ওয়্যারিং করার জন্য চুক্তিও নিয়ে থাকেন। সুইচ, সকেট, ফ্যান, সার্কিট ব্রেকারসহ সব বৈদ্যুতিক ফিটিংস লাগানো পর্যন্ত এক একটি আলাদা পয়েন্ট (সুইচ) ধরে ১৫০-২০০ টাকা ও চ্যানেল ওয়্যারিংয়ের জন্য ৮০-১০০ টাকা পয়েন্ট হিসেবে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করেন।

সম্প্রতি নিলুফা ইয়াসমিনের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তিনি পাশের গ্রামে বিদ্যুতের কাজ করতে গেছেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায় আকাশি রঙের গাউন ও মাথায় হলুদ হেলমেট পরে বিদ্যুতের কাজ করছেন তিনি। কাজ শেষে বাড়িতে এসে তাঁর সংগ্রামী জীবনের গল্প শোনালেন নিলুফা ইয়াসমিন।

নিলুফা জানান, ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। তবে দারিদ্র্যের অভিশাপে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘সেলাইয়ের কাজ তেমন আসত না। চিন্তা করি অন্য কিছু করতে হবে। হঠাৎ মাথায় আসে প্রতিটি বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ রয়েছে। কিন্তু গ্রামে বিদ্যুৎ মিস্ত্রি খুব বেশি নেই। বিদ্যুতের কোনো সমস্যা হলে মিস্ত্রির জন্য শহরে যেতে হয়। তাই সিদ্ধান্ত নিই ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ শিখব। পরে শফিকুলের পরামর্শে আরইএইচএবিতে বিদ্যুতের কাজ শিখতে যাই। গ্রামের মানুষ নানা সমালোচনা করেছে। তবু হাল ছাড়িনি। লেভেল-১ প্রশিক্ষণ শেষ করেছি, আরো তিনটি লেভেল শেষ করার ইচ্ছা আছে। যারা আমাকে নিয়ে নানা কথা রটিয়েছে, তারাই এখন বাড়ি এসে আমার কাজের প্রশংসা করে। ইলেকট্রিকের কাজ করে এখন নিজে লেখাপড়া করি, সন্তানকে লেখাপড়া করাই এবং সংসারে খরচ করতে পারি।’

নিলুফার মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘এহন নিলুফারে বেহেই (সবাই) ভালা কয়। কারেন্টের কাম কইরা দিতে নিলুফারে বাইত আইয়া লইয়া যায় গেরামের মানুষ।’

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ফুলবাড়িয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক অনিতা বর্ধন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলায় একজন নারী ইলেকট্রিশিয়ান রয়েছে আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। সমাজে নারীদের জন্য এটি একটি দারুণ সুসংবাদ। পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব কাজেই মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা