kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

দুই মেয়ের গলা কেটে আত্মহত্যাচেষ্টা মায়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই মেয়ের গলা কেটে আত্মহত্যাচেষ্টা মায়ের

‘পারিবারিক অশান্তি’র কারণে দুই শিশুসন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে নিজে আগুনে পুড়ে মরার চেষ্টা করেছেন এক নারী। হত্যার পর শিশু দুটিকে পুড়িয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেন তিনি। শুক্রবার রাতে নৃশংস এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ গোড়ানের ৩৯৭ নম্বর (মোল্লা ভবন) বাড়ির চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে। নিহত শিশু দুটির নাম মেহজাবীন আলভী (১১) ও জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত (৮)। তাদের একজন চতুর্থ অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।

গতকাল শনিবার সকালে দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে খিলগাঁও থানা পুলিশ। তাদের মা আখতারুন্নেসা পপিকে (৩৫) দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ পাহারায় তাঁর চিকিৎসা চলছে। তাঁর শরীরের ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। গতকাল বিকেলে স্ত্রীকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন শিশুদের বাবা মোজাম্মেল হক বিপ্লব।

পুলিশ ও নিহতের আত্মীয়রা জানায়, বিপ্লবের সঙ্গে ১৫ বছর আগে বিয়ে হয় পপির। এরপর তাঁদের ঘরে আসে দুই সন্তান। পপি তাঁর সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। আর বিপ্লব মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ব্যবসা করতেন। বেশ কিছুদিন ধরে বিপ্লবের সঙ্গে পপির সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছিল।

আত্মীয়রা জানায়, পপির মোবাইল ফোনে তাঁর বাবা গতকাল শনিবার সকাল থেকে কল করছিলেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরেনি। পরে কাছে থাকা বাসা থেকে তাঁর বাবা এই ফ্ল্যাটে আসেন। সকাল ৮টার দিকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে হামাগুড়ি দিয়ে পপি দরজা পর্যন্ত এসে দরজা খুলে দেন। তাঁর বাবা দেখতে পান পপি অগ্নিদগ্ধ। ভেতরে গিয়ে দেখতে পান তাঁর দুই নাতনির লাশ। পরে আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজনও জানতে পারে বিষয়টি। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পপিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। আর দুই শিশুর লাশ পাঠায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

পুলিশ জানিয়েছে, দুই শিশুকে হত্যার পর পপি ঘরে থাকা কাপড় জড়িয়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। নিজের গায়ে আগুন দেওয়ার সময় নিহত শিশুদেরও পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। শিশুদের লাশের গায়ের কিছু অংশ পোড়া আছে। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, বিছানার ওপর রক্তমাখা চাদর পড়ে আছে। কিছু রক্ত ফ্লোরেও পড়ে আছে। পুলিশ বাড়িটিতে অবস্থান নিয়েছে। ঘটনার খবর শুনে শত শত লোক ছয়তলা বাড়িটির সামনে ভিড় করে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরের লোকজনকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিন আলামত সংগ্রহ করে। 

পুলিশ জানায়, দুই শিশুর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করার সময় তাদের পাশ থেকে একটি রক্তমাখা বঁটি ও একটি রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। একটি কাগজে সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে। যাতে পপি তাঁর ‘মৃত্যুর জন্য’ সংসারের অশান্তির কথা লিখে রেখেছেন। তবে তিনি মারা যাননি।

খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, গত শুক্রবার রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হয়। এরই জের ধরে পপি তাঁর দুই মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পপি আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়েছেন। তিনি পরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

পপির ভাই অনীক জানান, বিপ্লব শ্রীনগরে ব্যবসা করেন। তাঁর বোন দুই মেয়েকে নিয়ে ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁদের বড় মেয়েটি ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। একই স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত ছোট মেয়েটি।

পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সকালে পপির বাবা খুব জোরে বাইরে থেকে দরজা খোলার জন্য ধাক্কা দিচ্ছিলেন, কিন্তু দরজা খোলা হচ্ছিল না। বেশ শব্দ হচ্ছিল। পরে আমরাও যাই। এই পরিবারের লোকজন অন্যদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করত না। পপি মেয়েদের স্কুলে আনা-নেওয়া করতেন। প্রায়ই বাচ্চাদের মারধর করতেন তিনি। বাইরে থেকে তা বোঝা যেত।’ 

গতকাল বার্ন ইউনিটে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক পর্যায়ে কথা বলেন পপি। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সন্তানদের হত্যা করি।’ কেন নিজের সন্তানদের হত্যা করলেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছিলাম না। সংসারের ঠিকমতো খরচ দিত না। সময়মতো ঘর ভাড়া দিত না। আমি বাড়ির মালিকের কথা শুনতাম। সপ্তাহে একবার দুবার আসত, এসব নিয়ে কথা বললে গালাগাল করত। আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করত।’

পপি আরো বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে ৪০ দিনের চিল্লায় যায় শিশুদের বাবা। এই ৪০ দিন আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি সে। তেমন কোনো খরচও দিয়ে যায়নি। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলেই সে আমাকে তালাক দেবে বলে হুমকি দিত। অন্যত্র বিয়ে করবে, এসব হুমকিও দিত। বাচ্চাদের পড়াশোনার কথা বলতে গেলেই সে বলে, ‘তুমি বাচ্চাদের নিয়ে শ্রীনগরে চলে আসো। বাচ্চাদের এখানে ভর্তি করাব। এখানে ভালো মাদরাসা আছে।’ গত মাসের ২৮ তারিখে সর্বশেষে ঢাকায় আসে সে। গত শুক্রবার আবার আসার কথা থাকলেও আসেনি।

খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, তার ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। ফলে অর্থনৈতিক টানাপড়েন যাচ্ছিল। এ অবস্থায় ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য তিনি রিকোয়েস্ট করছিলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী তা শোনেননি। আর সামান্য বিষয় নিয়েই তাঁর স্ত্রী প্রচণ্ড রাগারাগি করতেন। তাঁদের মাঝে প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি হতো বলে জানিয়েছেন তিনি।’

কালের কণ্ঠের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিপ্লবের বাড়ি শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। তিনি শ্রীনগর বাজারে ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবসা করেন। শ্রীনগরে আলাদা ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকেন। বিপ্লবের আলাদা বসবাসের কারণে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো। মাঝেমধ্যে ঢাকার বাসায় গিয়েও থাকতেন। তাঁর শ্বশুরবাড়ি সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা গ্রামে।

গতকাল বিকেলে দুই শিশুর লাশ তাদের বাবা মর্গ থেকে গ্রহণ করেন। গত রাতে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের রাঢ়িখাল জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্বজন ও এলাকাবাসী কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে গ্রামের বাড়ির কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিপ্লবের ছিল একাধিক গার্ল ফ্রেন্ড। এদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক নারী নেত্রীর নিয়মিত যাতায়াত ছিল বিপ্লবের ফ্ল্যাটে। এ ঘটনা এলাকার সবাই জানে, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নারী নেত্রীকে বা বিপ্লবকে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি। বিপ্লব ব্যবসা থেকে যা আয় করতেন তার অধিকাংশই খরচ করতেন ওই নেত্রীর পেছনে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা