kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

আমন সংগ্রহ পরিকল্পনায় গলদ!

৪ বিভাগে ব্যর্থতা ৩ বিভাগে অতিরিক্ত সংগ্রহ

তৌফিক মারুফ   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাত বিভাগের মধ্যে চার বিভাগেই সরকারের আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। তবে বাকি তিন বিভাগ থেকে আসছে অতিরিক্ত সংগ্রহ। এ ক্ষেত্রে বারবার লক্ষ্যমাত্রা সমন্বয়, সমর্পণ ও পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে। নানা কৌশল নিয়েও চার বিভাগে ধান সংগ্রহে সুফল আসছে না প্রত্যাশিত হারে। এমনকি খাদ্য অধিদপ্তর থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে না স্থানীয় খাদ্য বিভাগ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগ। অতিরিক্ত সংগ্রহ হচ্ছে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনায়। নতুন বিভাগ ময়মনসিংহ এবার প্রক্রিয়ায় আসেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে স্থানীয় পর্যায়ের খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও কেন্দ্রীয় দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ও চাহিদা নিরূপণেই গরমিল ছিল। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে লক্ষ্যমাত্রা বারবার পরিবর্তন করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আক্তারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় অনেক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে কোন এলাকায় কোন ধান উৎপাদন কম বা বেশি হয়, কোন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদের আগ্রহ কম বা বেশি, কোন এলাকায় ধানের উৎপাদন খরচ কম বা বেশি, এমনকি কোন এলাকায় প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতি কিংবা রোগ-বালাইয়ের উপদ্রব বেশি বা কম থাকে সেগুলোও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

ওই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, অনেক এলাকায় কৃষকরা তার বার্ষিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত আমন ধান চাষ করেন না। ফলে তিনি যা উৎপাদন করেন সেটা আর বিক্রি করবেন না। আবার এমন অনেক কৃষক আছেন যাঁরা সামনে দাম বৃদ্ধির আশায় সরকারের কাছে ধান বিক্রি না করে বরং তা ধরে রাখেন। আবার অনেক এলাকায় বেশি জমি থাকলেও উৎপাদন কম হয়। তাই জমির পরিমাণ অনুসারে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাও ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিকল্পনার সময় সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে গলদ যেমন এড়ানো যাবে, তেমনি ব্যর্থতাও কমানো যাবে।

তবে খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের উপপরিচালক আলমগীর কবীর বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে যা সংগ্রহে এসেছে তা সন্তোষজনক। গত ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ মেট্রিক টন ধান এবং প্রায় দুই লাখ ৫২ হাজার ৮২৭ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। বাকি যে কদিন আছে তাতে আরো সংগ্রহ হবে। হয়তো অল্প কিছু ঘাটতি থাকতে পারে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় আগের অর্জনের সঙ্গে কিছুটা ধারণানির্ভর পরিকল্পনা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যে এলাকায় উৎপাদন কম হয় সেখানে সংগ্রহও কম হয়। আবার যেখানে উৎপাদন বেশি হয় সেখানে সংগ্রহও বেশি হয়।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে আমন মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ ছিল প্রায় ১০ বছর। গত ২০ নভেম্বর থেকে ছয় লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নামে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া চার লাখ টন সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ শুরু হয় ১ ডিসেম্বর থেকে। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় এবং ২৫ হাজার মিলারের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবার আমন ধান সংগ্রহ করতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে—রংপুর বিভাগে প্রথমে এক লাখ ২৬ হাজার ৮৮৩ টন (পরে দুই দফা বাড়ানো হয়), ঢাকা বিভাগে এক লাখ ১০ হাজার ৪৯৫ টন, রাজশাহী বিভাগে ৯০ হাজার ৩৭৬ টন (পরে দুই দফা বাড়ানো হয়), খুলনা বিভাগে ৮৫ হাজার ৬৮৮ টন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮২ হাজার ৩০ টন, বরিশাল বিভাগে ৬০ হাজার ৫৪৪ টন এবং সিলেট বিভাগে ৪৩ হাজার ৯৮৪ টন। প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৬ টাকা।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদের সই করা এক নির্দেশপত্র পাঠানো হয় ঢাকা, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের কাছে। এতে বলা হয়, চলতি আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত অর্জন করতে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ অবশিষ্ট রয়েছে ঢাকা বিভাগে ২৬ হাজার ১২৩ টন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৮ হাজার ৮৩৬ টন, খুলনা বিভাগে ১৩ হাজার ৪৮২ টন, বরিশাল বিভাগে ৩৬ হাজার ৮৪৮ টন এবং সিলেট বিভাগে ২৩ হাজার ১১০ টন।

একই তারিখে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ) আনিসুজ্জামান আরেক চিঠিতে রংপুর ও রাজশাহীর বিভাগীয় খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চাহিদা অনুসারে তাঁদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে রংপুরে আগের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আরো ৩০ হাজার টন এবং রাজশাহীর ক্ষেত্রে আরো ৩৪ হাজার ১০০ টন বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা চেয়েছিলেন স্ব স্ব আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। তবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাঁদের ওই চাহিদার বিপরীতে রংপুরে পাঁচ হাজার ৮৬৭ টন যোগ করে এক লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ টন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে পাঁচ হাজার ৮৬৭ টন যোগ করে এক লাখ তিন হাজার ৪৬০ টন লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের ওই চিঠিতে চট্টগ্রাম বিভাগের আগের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১১ হাজার ৭৩৩ টন লক্ষ্যমাত্রা সমর্পণ করার পর ওই বিভাগকে ৭১ হাজার ৮২০ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা