kalerkantho

বুধবার । ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩ জুন ২০২০। ১০ শাওয়াল ১৪৪১

কক্সবাজার এলএ অফিসে তদবিরবাজের ভিড়

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কক্সবাজার এলএ অফিসে তদবিরবাজের ভিড়

তদবিরবাজের ভিড় জমেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে (এলএও)। এদের মধ্যে স্থানীয়চক্রের চেয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার দালালই বেশি। তাদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে। সার্ভেয়ারসহ এলএ অফিসে কর্মরত অন্যদের আত্মীয়স্বজনের একটি অংশও দালাল হিসেবে তৎপর।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন প্রকল্প চলছে কক্সবাজারে। ৭০টির বেশি প্রকল্পে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলছে। প্রকল্পগুলোর জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২০ হাজার একরের বেশি পরিমাণ জমি।

পর্যটন জেলাটি এমনিতেই শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে আছে।

তদুপরি ভূ-সম্পত্তির মালিকদের বেশির ভাগই গ্রামের নিরীহ শ্রেণির মানুষ। এসব লোকজন ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতেও ঝক্কি-ঝামেলা বা ঘাটে ঘাটে দৌড়ঝাঁপ করতে চায় না। আর সেই সুযোগই নিয়ে থাকে অস্থানীয় দালালরা। তারা বেশি কমিশনে দেনদরবার করে এলএ অফিসের সার্ভেয়ার, কানুনগোসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করে দেয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, ‘স্বচ্ছতার মাধ্যমে জমির অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে আসছি। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের নিজ হাতে চেক দেওয়ার সময় জানতে চাই যে অফিসের কাউকে অবৈধ টাকা দিতে হয়েছে কি না। লোকজন এ রকম অভিযোগ করলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা। এলএ অফিসে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগ উঠেছে, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাদেরও অনেকে কক্সবাজার এলএ অফিসে সশরীরে হাজির হয়ে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা আদায়ের বিষয়ে তদবির করেন। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব পরিচয় দিয়েও প্রায়ই তদবিরের কাজ করেন এক ব্যক্তি। তদুপরি তদবিরবাজদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হচ্ছেন উত্তরবঙ্গের হারুন নামের একজন। এই দালাল কক্সবাজার শহরের পেশকারপাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করে তদবির তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এলএ অফিসে তদবিরে তৎপরদের মধ্যে ঢাকার দুজন বেশ পরিচিত মুখ। তাঁরা হলেন মানিক প্রকাশ ঢাকাইয়া মানিক ও বাবুল। আবার এখানে কর্মরত সার্ভেয়াররা তাঁদের আত্মীয়স্বজনকে এখানে নিয়ে এসে তদবিরের কাজে লাগিয়ে টাকা হাতাচ্ছেন। র‌্যাবের অভিযানে পলাতক থাকা সার্ভেয়ার ফেরদৌস খান ফুফাতো ভাই রাসেলকে বছর দেড়েক আগে কক্সবাজারে নিয়ে আসেন তদবিরের কাজে লাগাতে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, সার্ভেয়ার ফেরদৌস খানের বাসায়ই থাকেন ফুফাতো ভাই রাসেল। প্রতিদিন একটি ব্যাগ নিয়ে রাসেল এলএ অফিসে আসতেন। সন্ধ্যায় টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে ফিরতেন বাসায়। র‌্যাবের অভিযানে ফেরদৌস খানের বাসা থেকে নগদ ২৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তদবিরের কাজ করা মহেশখালী দ্বীপের বাসিন্দা সাবেক ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমও থাকতেন ফেরদৌস খানের বাসায়। র‌্যাবের অভিযানের পর তাঁরা সবাই পলাতক।

র‌্যাব-১৫ ক্যাম্পের সদস্যরা গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলা এলএ অফিসে কর্মরত তিনজন সার্ভেয়ারের বাসায় হানা দিয়ে নগদ ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা উদ্ধার করেন। সে সঙ্গে উদ্ধার করা হয় সাত বস্তা জমির মূল্যবান কাগজপত্র ও ব্যাংকের চেক। র‌্যাবের অভিযানে সার্ভেয়ারদের বাসা থেকে টাকার অঙ্ক উল্লেখ না করে শুধু স্বাক্ষরযুক্ত চেকও উদ্ধার করা হয়েছে।

এক বছরের অধিক সময় ধরে এভাবেই বিপুল পরিমাণ অর্থের চেক নিয়ে পরে তা ভাঙিয়ে নিয়েছে গ্রেপ্তার হওয়া সার্ভেয়ার ওয়াসিম, পলাতক সার্ভেয়ার ফরিদ ও ফেরদৌস সিন্ডিকেট। এ ঘটনায় দুদক আইনে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলাও হয়েছে।

কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-এর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ জানান, গ্রেপ্তার হওয়া সার্ভেয়ার বরিশাল সদরের ওয়াসিম খান র‌্যাবের কাছে অনেক তথ্য দিয়েছেন। তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় নগদ পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তিনি এলএ অফিসে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের দায়িত্বে ছিলেন।

র‌্যাব সদস্যরা অভিযান চালিয়ে কক্সবাজার শহরে সার্ভেয়ার ফরিদের বাসা থেকে ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ফেরদৌস খানের বাসা থেকে ২৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা জব্দ করেন। ফরিদ ও ফেরদৌস মহেশখালী দ্বীপে অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের দায়িত্বে ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসাধু সার্ভেয়াররা প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বিকেলের ফ্লাইটগুলোতে টাকার বস্তা নিয়ে ঢাকায় ফিরে যান। আবার রবিবার সকালের ফ্লাইটে কক্সবাজারে আসেন। কক্সবাজার এলএ অফিসে অধিগ্রহণ করা জমির প্রকল্প অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে তিন ভাগ করে সার্ভেয়াররা কাজ করছেন। সার্ভেয়ারদের মধ্যে বেপরোয়া বলে অভিযোগ উঠেছে এক ও দুই নম্বর গ্রুপে কর্মরতদের বিরুদ্ধে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা