kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

দৌলতদিয়ায় আরেক যৌনকর্মীর জানাজা

‘অহোন মইরাও শান্তি পামু’

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি    

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দৌলতদিয়ায় আরেক যৌনকর্মীর জানাজা

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় পুরনো প্রথা ভেঙে ইসলামী রীতিতে আরেকজন যৌনকর্মীর জানাজা ও দাফন করা হয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে। বৃহস্পতিবার দুপুরে মারা যাওয়া যৌনকর্মী রীনা বেগমের জানাজা পড়ানো হয় বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে।

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীসংলগ্ন কবরস্থানে জানাজায় রাজবাড়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকির আব্দুল জব্বার, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, গোয়ালন্দ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল-মামুন, গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. আশিকুর রহমান, দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মণ্ডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো হামিদা বেগম নামের এক যৌনকর্মীর জানাজা পড়িয়ে লাশ দাফন করা হয়েছিল। ওই জানাজার আয়োজনও করা হয়েছিল ওসি আশিকুর রহমানের উদ্যোগে। তবে সেই জানাজার নামাজ পরিচালনা করা দৌলতদিয়া রেলস্টেশনের ইমাম গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিলেন যে তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না। হামিদা বেগমের জানাজা পড়ানোর পর স্থানীয়ভাবে সমালোচনার মুখে পড়ার কারণেই তিনি আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা না পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ওই ঘটনার পর রাজবাড়ী জেলার ইমামদের সমিতির পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়, যেখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তিনি ইমামকে বাধ্য করেছিলেন যৌনকর্মীর জানাজা পড়াতে। তবে আশিকুর রহমান বলেন, তিনি কোনো জোর করেননি। তাঁর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই ইমাম জানাজা পড়াতে রাজি হয়েছিলেন। স্থানীয় ইমামদের সমিতির পক্ষ থেকে এমনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাঁরা আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না।

বৃহস্পতিবার রীনা বেগমের জানাজা পড়ান গোয়ালন্দ থানা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ আবু বক্কর। ওসি আশিকুর বলেন, ‘স্থানীয় ইমামদের অনেকেই যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কাউকে যেহেতু ধর্মীয় কাজে জোর করা যায় না, তাই আমি থানা মসজিদের ইমামকে অনুরোধ করি জানাজা পড়াতে। তিনি রাজি হওয়ার পর জানাজার আয়োজন করা হয়।’

এত দিন যৌনকর্মীদের মৃত্যুর পর লাশ মাটিচাপা অথবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এ নিয়ে যৌনকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছিল। দুই সপ্তাহের মধ্যে দুজন যৌনকর্মীর ইসলামী রীতিতে জানাজা ও দাফন হওয়ায় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন যৌনপল্লীর নারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবেগ-আপ্লুত এক নারী বলেন, ‘আমার মতোন মাইয়ারা কেউ শখ কইরা এইখানে আসে নাই। কপাল দোষে আমরা অহোন যৌনকর্মী। তাই বইলা আমরা কি মানুষ না। মরোনের পর আমাগো জানাজা হইবো না? দাফন-কাফন হইবো না? যেই মাইষেরা (পুরুষ) আমাগো কাছে আহে, মরোনের পর তাগো জানাজা হইলে আমাগো বেলায় তা হইবো না ক্যান? তয়, জানাজার নিয়ম শুরু হওনে অহোন মইরাও আমরা শান্তি পামু।’

দৌলতদিয়া পতিতাপল্লীর যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘অসহায় নারী ঐক্য’র সভাপতি ঝুমুর আক্তার বলেন, ‘কোনো যৌনকর্মী মারা গেলে তাঁর লাশ মাটিচাপা অথবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। বিষয়টি জেনে থানার বর্তমান ওসি সাহেব আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বহু বছরের পুরনো প্রথা তিনিই ভেঙে দিয়েছেন। হামিদার পর রীনা ওরফে মিনুর জানাজা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনেও তা অব্যাহত থাকুক।’

গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. আশিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরোপুরি ইসলামী নিয়ম-কানুন মেনে জানাজা পড়িয়ে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর মৃত ওই দুই নারী হামিদা ও রীনার লাশ দাফন করা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা