kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

শহীদ মিনারের জায়গায় আবার উঠেছে সেই ‘পীরের মাজার’

শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্য ও চেতনা নষ্ট করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল সেই মাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শহীদ মিনারের জায়গায় আবার উঠেছে সেই ‘পীরের মাজার’

বাঙালি চেতনার সূতিকাগার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। বছরের একটি দিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থাকে সুরক্ষিত ও সুসজ্জিত। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। বছরের বাকি দিনগুলোয় অবেহলা ও অযত্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ভাষাশহীদদের স্মরণে নির্মিত অমর স্মৃতিসৌধ শহীদ মিনার।

২০১২ সালে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। পাশাপাশি তখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জায়গা দখল করে গড়ে উঠা কথিত পীরের মাজার অপসারণেরও আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এ রায় বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ আদালত ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। সে মোতাবেক শহীদ মিনারের জায়গায় গড়ে উঠা কথিত পীরের মাজার উচ্ছেদ করা হয়েছিল, কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উদাসীনতা ও অবহেলায় আবার আস্তানা গেড়েছে কথিত পীরের ভক্ত-আশেকানরা। ইতিমধ্যে তারা শহীদ মিনারের জায়গায় নির্মাণ করেছে কথিত মাজার ও ভক্ত-আশেকানদের থাকার জায়গাসহ নানা স্থাপনা।

২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠ’র প্রথম পৃষ্ঠায় ‘বেড়ে উঠছে কথিত মাজার/ হুমকিতে শহীদ মিনার’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় প্রধান প্রতিবেদন। কালের কণ্ঠে এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সুরক্ষাসহ আশপাশের সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান। পরের দিন কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশের সব অবৈধ স্থাপনা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উচ্ছেদ করার আদেশ দেন। একই সঙ্গে উচ্চ আদালত শহীদ মিনারের জমি রক্ষায় কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। সংস্কৃতিসচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান স্থপতি, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল ডিভিশন), ঢাকার জেলা প্রশাসক ও শাহবাগ থানার ওসিকে ১২ দিনের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

তখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ত্বরিত উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এ রায় কার্যকর করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-আমিনের নির্দেশে শুরু হয় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার অভিযানে উচ্ছেদ করা হয় ২০টি স্থাপনা।

কালের কণ্ঠ’র সেই প্রতিবেদনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘এখানে কখনো কোনো মাজার ছিল না। ছিল সাধারণ একটা কবর।’ সেই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কবরটি ছিল মেডিক্যাল কলেজের কোনো এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর। পরে সেই কবরটিকে ঘিরে নব্বইয়ের দশকে এবং ২০০০ সালের দিকে ধীরে ধীরে মাজার গড়ে তুলেছে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। দখল করে নিয়েছিল শহীদ মিনারের প্রায় ২০ কাঠা জমি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্য আশপাশের যে চার একর জমি বরাদ্দ আছে, সেখান থেকেই দখল নেওয়া হয়েছিল ওই জায়গা।

গতকাল শুক্রবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘুরে দেখা যায়, বহাল তবিয়তে রয়েছে সেই কথিত পীরের মাজার। যে কবর ঘিরে মাজার গড়ে উঠেছিল, সেই কবর এখনো লালসালুতে মোড়া। সেখানকার প্রবেশদ্বারের ওপর লেখা রয়েছে ‘হযরত তেল শাহ (রহ.) মাজার শরীফ’। প্রতি সপ্তাহে একবার মিলাদ এবং নিয়মিত গানবাজনাও হয়ে থাকে সেখানে। তার আড়ালে প্রতিদিনই এ মাজারে মাদক সেবন, যৌনকর্মসহ ‘নানা অপকর্ম’ হয়ে থাকে বলে অভিযোগ করেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শহীদ মিনারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা রিয়াদ হাসান ও মো. ইকবাল হোসেন।

বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহীদ মিনারকে বিতর্কিত করার জন্য, শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্য ও চেতনা নষ্ট করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল সেই মাজার। এ মাজারের সঙ্গে ব্যাবসায়িক স্বার্থও জড়িত। দেশের নানা স্থান থেকে চিকিৎসার জন্য গ্রামের মানুষ আসে। তাদের অনেকেই মাজারে অর্থ দান করে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ও ভাষা আন্দোলন গবেষক গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘শহীদ মিনারের পাশে কখনো কোনো পীরের কবর ছিল না, কখনো কোনো মাজার ছিল না। শহীদ মিনারকে গ্রাস করার জন্য, শহীদ মিনারকে বিতর্কিত করার জন্য এটি তাদের পাঁয়তারা।’

শহীদ মিনারের জায়গা দখল করে আবার মাজার নির্মাণের কথা জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনারের জায়গায় মাজার গড়ে তোলার কোনো সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও রায় রয়েছে। মাজারটি হাইকোর্টের নির্দেশে অবৈধ ঘোষণার পর সেখানকার সব কিছু ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এখন যারা এ কবরকে আবার মাজার করার পাঁয়তারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা