kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

সব পথ আজ শহীদ মিনারে

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

নওশাদ জামিল   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সব পথ আজ শহীদ মিনারে

সব পথ আজ মিলে যাবে গর্ব ও আত্মত্যাগের প্রতীক শহীদ মিনারে। প্রভাতফেরি করে খালি পায়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে যাবে শহীদ মিনারে, হাতে থাকবে ফাগুনের ফুল, কণ্ঠে থাকবে সেই অমর গান—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’। ভাষাশহীদদের প্রতি নিবেদন করা শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে যাবে শহীদ মিনারের বেদি। আজ শুক্রবার, ৮ ফাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারি; মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দেশে এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালি জাতি আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় শহীদ বীর সন্তানদের। পাশাপাশি আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে এ ঐতিহাসিক দিনটি। 

মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৫২ সালের আজকের এই দিনে বাংলা মায়ের বীর সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হয়েছিল ভাষার জন্য আত্মত্যাগের অভূতপূর্ব এক ইতিহাস। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির এ আত্মত্যাগ প্রাণিত করেছিল সারা বিশ্বের মানুষকে। তারই ফলে মেলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে ইউনেসকো। ফলে সেই থেকে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় পৃথিবীর সব দেশে। 

বরাবরের মতো এবারও বাঙালির প্রেরণার অন্যতম উৎস অমর একুশ পালনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যথাযথভাবে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সাজানো হয়েছে শৈল্পিকভাবে। রং করা হয়েছে মূল বেদিসহ সংলগ্ন এলাকা। রাস্তার পাশের দেয়ালে শোভা বাড়িয়েছে ভাষা আন্দোলনের নানা গান, কবিতা ও স্লোগান।

দিবসের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষা আন্দোলনের বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরপরই প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কালজয়ী গানটি বাজানো হয়।

দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি, পাশাপাশি সরকারি ছুটির দিনও। দেশের সর্বত্র আজ প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে শহীদদের স্মৃতির প্রতি। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারে শহীদ দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্র ও অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে।

১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সৃষ্টি হয় ভাষা-বিরোধ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রতিবাদে সোচ্চার হন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন, ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান (উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)।’ সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা ‘নো’ ‘নো’ ধ্বনি তুলে প্রতিবাদ জানান। এরপর ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এই ঘোষণার পর থেকেই তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষা প্রচলনের চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। আর একুশে ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫২ সালের একুশে  ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ঘটেছিল বাঙালির ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার ঘটনা। এদিন পাকিস্তানের স্বৈরশাসকের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ। আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়। এতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে নিহত হন। এরপর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা আন্দোলন। অবশেষে পাকিস্তান সরকার মেনে নেয় রাষ্ট্রভাষার দাবি। বাঙালির মধ্যে সৃষ্টি হয় জাতিসত্তা বোধ। তারই ধারাবাহিকতায় একাত্তরে বাঙালি জাতি অর্জন করে স্বাধীন ও স্বপ্নের বাংলাদেশ।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থান হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। বাদ জুমা অমর একুশে হলে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত, বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদুল জামিয়া, সব হলের মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষাশহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত বা প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।

দিবসটি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। সকাল সাড়ে ৬টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে সংগঠনের সব শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন। আজ সকাল ৭টায় কালো ব্যাজধারণ, প্রভাতফেরি করে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন। এ ছাড়া দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করবে সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, শিশু একাডেমিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা