kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

অনন্য হাসপাতাল কুমুদিনী

২৫০ টাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা!

রফিকুল ইসলাম, মির্জাপুর থেকে ফিরে   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



২৫০ টাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা!

পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লৌহজং নদী। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের এই নদীটি এখন মৃতপ্রায়। পানির প্রবাহ খুব কম। পারাপারে বাশের সেতু। নদীর এক পাশে ছোট ছোট দোকান আর বিপরীত পাশে তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মানবসেবার অনন্য প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী হাসপাতাল।

অসচ্ছল ও গরিব মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে ৮২ বছরের পুরনো এই হাসপাতাল। ক্রমাগত অসুখের ধরনে পরিবর্তনের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে কুমুদিনী হাসপাতাল। সেবায় আস্থার কারণে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা। স্থানীয়দের মতে, অসহায় ও গরিব মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিষ্ঠান এটি। মানবসেবার কারণে হাজারো মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে কুমুদিনী।

১৯৩৮ সালে লৌহজং নদীর তীরে দাদির নামে ‘শ্রীমতী শোভা সুন্দরী ডিসপেনসারি’ প্রতিষ্ঠা করেন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা (আরপি সাহা)। রণদার যখন সাত বছর বয়স, সেই সময় সন্তান প্রসবকালে মারা যান তাঁর মা কুমুদিনী দেবী। চিকিৎসার অভাবে আর যেন কারো মা মারা না যান সে জন্য রণদা প্রসাদ ১৯৪৪ সালে ওই ডিসপেনসারির স্থলে প্রতিষ্ঠা করেন বিনা মূল্যে সেবা পাওয়ার একটি হাসপাতাল। নাম দেন মায়ের নামে ‘কুমুদিনী হাসপাতাল’। ওই বছরের ২৭ জুলাই হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন বাংলার তদানীন্তন গভর্নর লর্ড আর জি কেসি। এটি এখন ১০৫০ শয্যাবিশিষ্ট। বছরজুড়ে একটি শয্যাও ফাঁকা থাকে না। কোনো কোনো সময় বাড়তি শয্যার ব্যবস্থা করে রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, জন্মলগ্নে রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নামমাত্র ফি নেওয়া হচ্ছে, যার নাম ‘পেসেন্ট পার্টিসিপেশন’; যা অন্য যেকোনো হাসপাতালের তুলনায় নগণ্য। বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে একজন রোগীকে ৫০ টাকায় টিকিট নিতে হয়। গুরুতর বা জরুরি চিকিৎসায় হাসপাতালে রোগীর ভর্তিতে ফি ২০০ টাকা। এর বাইরে আর কোনো ফি দিতে না হলেও বড় অপারেশনে ফি আর ওষুধ কিনতে হয় রোগীকে।

রোগী ভর্তির পর সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দেখাশোনা করে কুমুদিনী হাসপাতাল। এই হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সরাই রোগীর আপনজন। তাঁদের নিবিড় যত্নে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে রোগীরা। বিনা মূল্যে তিন বেলা রোগীকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দেওয়া হয়। দিনে একবার রোগীর সঙ্গে দেখা করতে পারে আত্মীয়-স্বজন। দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত রোগীর সঙ্গে থাকার পর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায় স্বজনরা। বাকি সময় যেকোনো প্রয়োজনে নার্সরাই হয়ে ওঠেন রোগীর স্বজন।

স্থানীয়রা বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে চিকিৎসা ও সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত রাখছে কুমুদিনী হাসপাতাল। চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালে যেখানে গলা কাটা ফি, সেখানে কুমুদিনী হাসপাতাল ব্যতিক্রম। নামমাত্র ফিতে সেবা নিতে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ভিড় করে শত শত রোগী। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি জেলার রোগীরাও এখানে আসে। সার্বক্ষণিক পাওয়া যায় ডাক্তার। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের পাশাপাশি ময়মনসিংহ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর অঞ্চলের রোগীর সংখ্যা বেশি। অন্য জেলা থেকেও আসে রোগীরা।

হাসপাতালের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এক বছরে কুমুদিনী হাসপাতালের বহির্বিভাগে তিন লাখ ৭৫ হাজারের মতো রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। ইনডোরে চিকিৎসা নিয়েছে ৪৫ হাজার রোগী। ৩০ হাজার রোগীকে অস্ত্রোপচারসেবা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরো ৩০ রোগীকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়েছে এই হাসপাতাল।

মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দক্ষিণে কুমুদিনী হাসপাতাল। হাসপাতাল রোডের এক পাশে জেনারেল হাসপাতাল এবং অন্য পাশে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ। হাসপাতালের মূল ভবনের বাইরে বহির্বিভাগ চিকিৎসাসেবা। আর মূল ভবনের পাশে বড় পুকুর ও পশ্চিম পাশে রয়েছে ভারতেশ্বরী হোমস।

গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে শতাধিক রোগীর ভিড়। রোগীর সঙ্গে তাদের আত্মীয়-স্বজনের ভিড়ে জনবহুল হয়ে উঠেছে স্থানটি। দুপুর পৌনে ২টায় হাসপাতালের প্রবেশপথে অপেক্ষমাণ ছিল শতাধিক মানুষ। জানা গেল, অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষ রোগীদের আত্মীয়-স্বজন। দুপুর ২টায় রোগীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাবে তারা। ঠিক ২টা বাজার সঙ্গে ঘণ্টা বাজলেই প্রবেশপথ খুলে দেওয়া হয়। দুই ঘণ্টার জন্য রোগীর স্বজনরা হাসপাতালে অবস্থান করতে পারবে। স্বজনদের কারো হাতে বাসায় রান্না করা খাবার। কারো হাতে ওষুধ, আবার কারো হাতে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড়।

কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার রায় বলেন, ‘চিকিৎসা ক্ষেত্রে কুমুদিনী হাসপাতালের ঐতিহ্য রয়েছে। চালুর পর থেকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৯৪ সাল থেকে ‘পেসেন্ট পার্টিসিপেন্ট বা রোগীর অংশগ্রহণ’ নামে সামান্য ফি নেওয়া হয়। এটা অন্য যেকোনো হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। একজন রোগীকে ভর্তির পর কোনো ফি দিতে হয় না। বেড ভাড়া নেই। রোগীকে তিন বেলা খাবার দেওয়া হয় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে।’

ষাটোর্ধ্ব স্থানীয় ব্যক্তি আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসাসেবায় এখানকার মানুষের খুব পরিচিত নাম কুমুদিনী হাসপাতাল। ছোট থেকেই দেখে আসছি হাসপাতালটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। শত শত মানুষকে সুস্থ করে তুলছে। যেকোনো অসুস্থতায় মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন এই হাসপাতাল। বছরের পর বছর এই হাসপাতাল মানুষকে সেবা দিয়ে যাক—এটাই আশা করছি।’

জামালপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা খোদেজা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অসুস্থ হলে আমরা এখানে ছুটে আসি। এখানে খরচ অনেক কম। ভর্তির সময় ২০০ টাকা নেওয়ার পর আর খরচ নেই। ওষুধ নিজেকে কিনতে হয়। এখানকার চিকিৎসাসেবায় মানুষ খুব সন্তুষ্ট।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা