kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

সপ্তাহে এক দিন ‘ক্ষুদ্র’ মাংস, দুই দিন মাছ

কারাবন্দিদের খাবার

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সপ্তাহে এক দিন ‘ক্ষুদ্র’ মাংস, দুই দিন মাছ

দেশের কারাগারে হাজতি ও কয়েদিদের জন্য দৈনিক খাবারের বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারি বরাদ্দের কম খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বন্দিদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হলেও কারা কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করছে না। এমনকি বন্দিদের নির্ধারিত বরাদ্দের কম পরিমাণে খাবার দেওয়ার কথাও অস্বীকার করছে কারা কর্তৃপক্ষ।

প্রতি বেলা খাবারে মাছ-মাংস বরাদ্দ মাত্র ৩৬ থেকে ৩৮ গ্রাম। এই খাবার মেন্যু প্রণয়ন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ১৮৬ বছর আগের খাবার মেন্যু দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের খাদ্য সরবরাহ করছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পরও সেই খাবার মেন্যু পরিবর্তন না হওয়াকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন খোদ কারা কর্মকর্তারা। তবে সম্প্রতি সকালের নাশতার মেন্যু পরিবর্তন করে নতুন মেন্যু চালু করেছে সরকার। এতে বন্দিরা খানিকটা সন্তুষ্ট। কিন্তু দুই বেলা খাবারে বন্দিদের স্বাস্থ্যগত পুষ্টিমান নিশ্চিত হচ্ছে না।

কারাগারের এক ডিআইজি নিশ্চিত করেছেন, ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত খাবার মেন্যু দিয়ে চলছে কারাবন্দিদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, ৩৬ গ্রামের একটি মাছের টুকরা কোন সাইজের হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমেয়। সাধারণ মানুষ প্রতি বেলা খাবারের সময় যে মাছের টুকরাটি খায়, সেটির ওজন ন্যূনতম ১০০ গ্রাম হয়। সেই মানুষটি যখন বন্দি হয়ে কারাগারে আসে তখন তাকে দেওয়া হয় ৩৬ গ্রাম ওজনের মাছের টুকরা বা ৩৮ গ্রাম ওজনের মাংস। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, দেশের যেসব কারাগারে গ্যাস নেই, সেগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি কাঠ সরবরাহ হয় না আবার মসলার হিসাব আরো কঠিন। ০.১ গ্রাম মসলার অনুপাতও আছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এত কম মসলা দিয়ে রান্না করা যে খাবার বন্দিদের দেওয়া হয়, তা-ও বন্দিদের জন্য সুখাদ্য বলা যায় না। কিন্তু এখানে কারা কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না।

আদালতে হাজিরা দিতে আসা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের একাধিক বন্দির সঙ্গে কথা বলে খাবার কম সরবরাহের বিষয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। হাজতি বন্দিরা জানান, তাঁরা কারাগারে দিনে দুই বেলা খাবার পাচ্ছেন। কিন্তু যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে, তাতে তাঁদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। সপ্তাহে এক দিন গরুর মাংস এবং দুই দিন মাছ দেওয়া হয়। সরবরাহ করা মাছ-মাংসের টুকরা এতই ছোট যে তা খাওয়া না খাওয়া একই কথা। এককথায় বলা চলে, ভাতের সঙ্গে মাছ-মাংস চোখে দেখা যায়, খেয়ে পেট ভরে না। একটি মামলায় ২২ দিন কারাহাজতে থাকার পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ওসমান গণি বলেন, ‘কারাগারে মাছ-মাংস দেখে দেখে ভাত খেয়েছি।’

আদালতে হাজিরা দিতে আসা হাজতি নুর উদ্দিন, আবদুল করিম, পলাশ দাশসহ কয়েকজন জানান, কারাবন্দিদের সকালে রুটির সঙ্গে সবজি দেওয়া হয়। সকালের নাশতা হিসেবে এক দিন সুজির হালুয়া এবং এক দিন খিচুড়ি দেওয়া হয়। সকালের নাশতার পর দুপুর ও রাতের খাবার নিয়েই মূল অসন্তোষ। প্রতিদিনই মুলা-বেগুনের স্তূপ নেওয়া হয় কারাগারের রান্নাঘরে। আর মাছ-মাংস ভাতের সঙ্গে দেওয়া হয় সপ্তাহে তিন দিন। এর মধ্যে দুই দিন মাছ এবং এক দিন মাংস। যাঁরা মাংস খেতে অভ্যস্ত নন, তাঁদের জন্য একটি করে ডিম দেওয়া হয়। সবজি খেতে খেতে নাভিশ্বাস হওয়ার পর যেদিন মাছ-মাংস পাতে পাওয়া যায়, সেদিন মনে কিছুটা স্বস্তিও মেলে। কিন্তু সেই স্বস্তি উবে যেতে সময় লাগে না। মাছ-মাংসের ঝোলই ভরসা হয়ে ওঠে।

কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া ওসমান গণির ভাষায়, ‘কারাগারে ভাতের সঙ্গে মাছ-মাংস যেন ধনীর বাড়ির শোপিস! শুধুই দেখা যাবে! মাছ-মাংসের সঙ্গে উপহার হিসেবে পাওয়া যায় ডাল। এই ডালপানি দিয়ে পান্তাভাত খাওয়া যায়।’

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘কারাগারে বন্দিদের কম খেতে দেওয়া হয় না। কোনো বন্দিই তো না খেয়ে কারাগারে মারা যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত হারে সমবণ্টনের মাধ্যমে বন্দিদের খাবার দেওয়া হয়।’ মাছ-মাংসের টুকরা ছোট হওয়া বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বন্দিদের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ, তা কাটার পর উচ্ছিষ্টাংশ বাদ যায়। এরপর যে পরিমাণ বরাদ্দ তার পুরো অংশই বন্দিদের খাবার হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এখন বন্দিরা যদি মনে করে, এই বরাদ্দে তারা পেটভরে খেতে পারছে না, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ বাড়ালে পরবর্তী সময়ে সেভাবে বন্দিদের খাবার বণ্টন করা হবে।’

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা