kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

চীনে করোনাভাইরাস

দেশে মোবাইলশিল্পে সংকটের আশঙ্কা

কাঁচামাল শেষের পথে, টান পড়তে পারে মাসখানেকের মধ্যে
অন্য দেশ থেকে চোরাই পথে ফের আমদানি বাড়ার আশঙ্কা

মাসুদ রুমী   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশে মোবাইলশিল্পে সংকটের আশঙ্কা

বৈশ্বিক মোবাইল হ্যান্ডসেটের কেন্দ্রবিন্দু চীনে করোনাভাইরাসের (কেভিড-১৯) কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও যার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস সংক্রমণে চীন বহির্বিশ্ব থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পণ্য সরবরাহ, কেনাবেচা বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশটির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মোবাইল সংযোজন শিল্প। ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করায় এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে কাঁচামাল সংকটে উত্পাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে দেশের শিল্পগুলো। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মোবাইল প্রদর্শনী মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।  

দেশে সব মিলিয়ে ৯টি মোবাইল ফোন কারখানা আছে। এর মধ্যে বড় পাঁচটি ব্র্যান্ড আছে, যারা এখন আর কোনো স্মার্টফোন আমদানি করছে না। দুটি দেশীয় কম্পানি ওয়ালটন ও সিম্ফোনির পাশাপাশি চীনের তিনটি কম্পানি ট্রানশান হোল্ডিং, ভিভো এবং অপ্পোও আর কোনো স্মার্টফোন আমদানি করে না। তারা যন্ত্রাংশ এনে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করে দেশের চাহিদা মেটাচ্ছে। মাত্র দুই বছর আগে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ এখন স্মার্টফোন উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ২০১৯ সালে যত স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে তার ৬২ শতাংশ উত্পাদিত হয়েছে বাংলাদেশে স্থাপিত কারখানাগুলোয়। কিন্তু চীন সংকটে এই যাত্রা ব্যাহত হতে পারে।

দেশের শীর্ষ মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্মাতারা জানান, তাঁদের হাতে যে পরিমাণ কাঁচামাল মজুদ আছে, তা দিয়ে আরো মাসখানেক চলবে। তবে চীনের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চীনভিত্তিক ব্র্যান্ড, যেমন—অপ্পো এবং ভিভোও বাংলাদেশে তাদের কারখানা স্থাপন করেছে। এসব কারখানায় যেসব চীনা নাগরিক ছিলেন, তাঁদের অনেকেই চীনা নববর্ষের ছুটিতে গিয়ে ফিরতে পারেননি। অপ্পো বাংলাদেশসহ আরো কয়েকটি ব্র্যান্ডের শীর্ষ চীনা কর্মকর্তারা ফিরতে পারেননি বলে জানা গেছে।

গাজীপুরে মোবাইল ফোন কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে চীনভিত্তিক বৈশ্বিক মোবাইল ব্র্যান্ড ট্রানশান। এন্ট্রি লেভেল থেকে শুরু করে মিড রেঞ্জের ফোন দিয়ে টেকনো ও আইটেল ব্র্যান্ড এরই মধ্যে দেশের বাজারের (ফিচার ও স্মার্টফোন) ৩০ শতাংশের বেশি অর্জন করেছে ব্র্যান্ডটি। তবে চীনের ভাইরাস ইস্যুতে দেশের মোবাইল সংযোজন শিল্পে সংকটের আশঙ্কার কথা জানালেন ট্রানশান হোল্ডিংস বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেজওয়ানুল হক। তিনি গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চায়নিজ নিউ ইয়ারের কারণে আগেই সবাই প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল এনেছিল। সে জন্য এখনই কোনো সরবরাহ সংকট তৈরি হয়নি। তবে আগামী মাস থেকেই পণ্যের সরবরাহ কমা শুরু হবে। এখন পর্যন্ত চীনের মোবাইল কারখানা বন্ধ আছে। কোনো কিছু আসছে না। ১৭ ফেব্রুয়ারির পর সরকারের অনুমতি নিয়ে স্বল্প পরিসরে খোলার কথা আছে। কিন্তু কারখানা খুললেও সব কর্মী আসবে, উত্পাদন শুরু হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মার্চের মধ্যে যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে সমস্যা হবে।’

সোনারগাঁয় কারখানা করেছে ইউনস্টার মোবাইল ফোনের মূল কম্পানি আনিরা ইন্টারন্যাশনাল। চীনের ভাইরাসের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানালেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দীন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান স্টক দিয়ে আর মাসখানেক কারখানা চালু রাখা যাবে, সংকট না কাটলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো কিছুই আমরা চীন থেকে আনতে পারছি না। তারা কোনো অর্ডার নিচ্ছে না। আমাদের যারা ব্যাবসায়িক পার্টনার আছে তারা ঘর থেকে বের হতে পারছে না। চীনের মোবাইল কারখানাগুলোর কর্মীদের বেশির ভাগই ভাইরাসের উত্পত্তিস্থল হুবেই নগরীর। এই শহরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় বেশি সমস্যা হচ্ছে।’  

২০১৭ সালে গাজীপুরের চন্দ্রায় প্রথম মোবাইল ফোন কারখানা স্থাপন করে ওয়ালটন। দেশে কারখানা চালুর পর এখন পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি মোবাইল হ্যান্ডসেট উত্পাদন ও বাজারজাত করেছে ওয়ালটন। ওয়ালটন মোবাইলের হেড অব সেলস আসিফুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কারণ আমাদের পর্যাপ্ত স্টক রাখা ছিল। তবে সমস্যা যদি আরো দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ঈদের আগে সংকট তৈরি হতে পারে।’

স্যামসাং স্মার্টফোনের সংযোজনকারী বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দীন বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কোনো সমস্যা দেখছি না। চায়নিজ নিউ ইয়ারের কারণে আমরা পর্যাপ্ত স্টক নিয়ে এসেছিলাম। তবে বৈশ্বিক মোবাইলের সাবকম্পোনেন্টগুলো মূলত তাইওয়ান, চীন থেকে আসে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তার ওপর পরবর্তী অবস্থা বলা যাবে।’ 

বর্তমানে বাজারে স্মার্টফোনের চাহিদা দেশীয় কারখানা থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। সরবরাহে টান পড়লে চোরাই পথে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে মোবাইল ফোন আমদানি আবারও বাড়তে পারে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা