kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ চৈত্র ১৪২৬। ৩১ মার্চ ২০২০। ৫ শাবান ১৪৪১

খুলনার কয়রা উপজেলা

নোনা পানির চিংড়ি চাষ নিয়ে টানাপড়েন

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নোনা পানির চিংড়ি চাষ নিয়ে টানাপড়েন

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলায় নোনা পানির চিংড়ি চাষ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। অনেকে চাচ্ছে কপোতাক্ষ নদের নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ অব্যাহত থাকুক। অন্যদিকে গ্রামবাসীদের একটি বড় অংশ নোনা পানির চিংড়ি চাষ চাচ্ছে না, তারা নোনামুক্ত কৃষিকাজের পরিবেশ চায়। এ দাবিতে তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কয়রা উপজেলা সদরের তিন কিলোমিটার পশ্চিমে কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন ২০০ একর জমির গোবরা বিলে প্রায় দুই দশক ধরে নদটি থেকে নোনা পানি টেনে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। গোবরা বিলের পাশ ঘেঁষে কপোতাক্ষ নদটি এঁকেবেঁকে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। আগে নদের পানি নদ বরাবর বাঁধ থেকে অনেক দূর দিয়ে প্রবাহিত হতো। এখন নদের পানি বাঁধের ওপর আছড়ে পড়ে। কারণ বাঁধের ভেতর নদের জমি ভেঙে নদে মিশে গেছে। স্থানীয় লোকজন জানায়, চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ যথেচ্ছভাবে কাটা ও ছিদ্র করায় বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ি চাষের শুরুর দিকে নদ থেকে সংযোগ খাল করে বাঁধ কেটে নদের নোনা পানি বিল বা জমিতে তোলা হতো। পরে সরাসরি বাঁধ কাটা হয়, যেখানে-সেখানে ছিদ্র করে পাইপ বসানো হয়। এতে বাঁধের নদপারের জমি ভেঙে নদে বিলীন হয়েছে। এখন বাঁধ ভাঙছে। বর্ষাকাল মানে আতঙ্ক। বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার আতঙ্কে থাকে এলাকাবাসী। দীর্ঘদিন নোনা পানিতে চিংড়ি চাষ করায় মাটিতে নুন জমেছে। ফলে জমিতে অন্য ফসল হতে চায় না। এ কারণে বিলে জমির মালিক ও লিজগ্রহীতাদের একটি পক্ষ চিংড়ি চাষ অব্যাহত রাখতে চায়। অন্যদিকে চিংড়ি চাষের ফলে ধান ও অন্যান্য ফসল না হওয়ায় বিলে জমির মালিকদের বেশির ভাগই চিংড়ি চাষ চান না। এ নিয়ে দুই পক্ষে যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল গফফার ঢালী বলেন, ‘এলাকাটি একফসলি, ধান ছাড়া কিছুই হয় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানাবিধ কারণে ধানও বেশি উৎপা   দিত হয় না। জমিতে লবণ জমে গেছে। পানির লবণ মাটিতে মিশে গেছে। তাই নোনা পানির ঘের ছাড়া এ বিল এলাকায় কিছুই করা সম্ভব নয়।’

মাঠে মাটির কাজ করছিলেন মান্নান মিস্ত্রি। তিনি জানান, তিনি চিংড়িঘেরের জন্য মাটির কাজ করছেন। গোবরা বিলে তাঁর চার একর জমির চিংড়িঘের রয়েছে। জমির মালিক কামরুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর এই ঘের। তিনি জমিতে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ করতে চান। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামের পুব দিকে তিন বছর আগে নোনা পানি তোলা বন্ধ করে দিলেও সেখানে ফসল ফলছে না। ফলে ফসল না হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে নোনা পানির চিংড়ি ভালো। কারণ তবু কিছু আয় হবে। কিছু না হলে তো একেবারেই শূন্য হাতে থাকতে হবে।’

কিন্তু একই এলাকার মেসবাহ উদ্দিন বলেন ভিন্ন কথা। বিলে তাঁর ১০ বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নোনা পানির চিংড়ি চাষ করছেন; কিন্তু আর তা চান না। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে চিংড়ির তেমন ফলন নেই। দামও ভালো পাওয়া যায় না। বাঁধ ভাঙে। এসব কারণে আর নোনা পানি টেনে তুলতে চাই না।’ তিনি হতাশার সুরে বলেন, ‘কিন্তু আমরা না চাইলে কি হবে, অনেকেই বাঁধ কেটে আবার নোনা পানি তোলার পাঁয়তারা করছে।’

নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ বন্ধ করে ধান চাষের সুবিধা সৃষ্টির জন্য এলাকার ১৩৬ জনের স্বাক্ষরসংবলিত একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পাউবোর কর্মকর্তাদের কাছে। কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে বলেন, নদ থেকে অবৈধ পদ্ধতিতে নোনা পানি না তুলেও চিংড়ি চাষ করা যায়। এতে ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করাও সম্ভব।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা