kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিদায় সংবর্ধনা নিতে গিয়ে চিরবিদায়

রাজধানীতে ওয়াসার গাড়ির ধাক্কায় এসএসসি পরীক্ষার্থী নিহত সহপাঠীদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি    

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিদায় সংবর্ধনা নিতে গিয়ে চিরবিদায়

রাজধানীর ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র এসএসসি পরীক্ষার্থী আবির ওয়াসার পানির গাড়ির চাপায় নিহত হয়। এ ঘটনার খবর স্কুলে পৌঁছলে শিক্ষকরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছবি : কালের কণ্ঠ

মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হবে আর মাত্র সাত দিন পর। এ উপলক্ষে পুরান ঢাকার ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের জন্য বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। সকাল থেকেই বিদায়ি শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে সংবর্ধনায় যোগ দিতে স্কুল প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করে। চলছিল উচ্ছ্বাস-আনন্দ। এ রকম উৎসবমুখর পরিবেশে যখন নেচে-গেয়ে পুরো স্কুল মাতিয়ে তুলছিল শিক্ষার্থীরা, ঠিক তখনই খবর ছড়িয়ে পড়ে তাদের সহপাঠী আবীর হোসেন গাড়ির ধাক্কায় মারা গেছে। মুহূর্তে আনন্দ উৎসবে নেমে আসে বিষাদের ছায়া।

গতকাল সোমবার সকালে ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের পানির পাম্পের পেছনে ঢাকা ওয়াসার বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় মারা যায় ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. আবীর হোসেন (১৫)। এ ঘটনায় গাড়ির চালক চুন্নু মিয়াকে আটক করেছে এবং গাড়িটি জব্দ করেছে পুলিশ।

এদিকে আবীর নিহতের ঘটনায় তার সহপাঠীরা চালকের বিচারের দাবিতে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা চালকের শাস্তি দাবি করে। একপর্যায়ে স্কুলের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেখানে আবীরের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল করা হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল কুদ্দুসও চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। আবীরের পরিবার চালকের ফাঁসি দাবি করেছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের ওয়ারী জোনের সহকারী কমিশনার তারিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনাটি মর্মান্তিক। ওয়াসার পানিবাহী লরির ধাক্কায় ওই ছাত্রের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। 

পারিবারিক সূত্র জানায়, সকালে জয়কালী মন্দিরের নিজের বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলের দিকে এগোতে থাকে আবীর। তার পরনে ছিল পাঞ্জাবি ও পায়জামা। ওয়ারী এলাকার বলধা গার্ডেনের পাশের সড়ক দিয়ে যাচ্ছিল আবীর। ওই সময় বলধা গার্ডেনের উত্তর পাশের গেটের সামনে ওয়াসার পানির পাম্প স্টেশন থেকে পানি নিয়ে বেপরোয়া গতিতে এসে ওয়াসার পানির লরি আবীরকে ধাক্কা দেয়। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে গেলে আবীরের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায় লরির চাকা। আবীরকে উদ্ধার করে পুলিশের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের জানিয়ে দেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। পরে আবীরের সহপাঠী ও এলাকাবাসী লরির চালক চুন্নুকে (৪৯) আটক করে পুলিশে দেয়।

পরিবার জানায়, আবীরের মা মিনু বেগম ১১ মাস আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আবীরের বড় ভাই ফয়সাল হোসেন পানিতে ডুবে পাঁচ বছর আগে প্রাণ হারায়। আবীরের বাবা হানিফ মিয়া পুরান ঢাকার নবাবপুরে খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন। বড় ছেলের মৃত্যুর পর হানিফ মিয়ার তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিল আবীর। বাকি দুই বোন লিমা আক্তার ও লিজা আক্তার আবীরের চেয়ে বড়।

লিমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবীর আমাদের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আমার ভাইকে যারা মেরে ফেলেছে তাদের ফাঁসি চাই।’

জরুরি বিভাগ থেকে আবীরের লাশ নেওয়া হয় ঢামেক মর্গে। সেখানে ছেলের নিথর দেহ দেখার পর বাবা ও বোনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। হানিফ মিয়া বলেন, ‘বড় ছেলের মৃত্যুর পর ছোট ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন আবীরও চলে গেল। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব।’ বলে তিনি জ্ঞান হারান।

ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি ওয়াসার গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। তার এই ঘটনার জন্য আমরা সবাই মারাত্মক ব্যথিত। আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা