kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

যশোরে গণপিটুনিতে ২০ দিনে ছয়জনকে হত্যা

এবার একজনকে ভ্যানচোর সন্দেহে হত্যা

ফিরোজ গাজী, যশোর ও মাসুদ তাজ, অভয়নগর   

২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যশোরে গণপিটুনিতে ২০ দিনে ছয়জনকে হত্যা

যশোরের অভয়নগরে এবার ভ্যানচোর সন্দেহে ইলিয়াস শেখ (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোররাতে উপজেলার শুভরাড়া ইউনিয়নের মাঠপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত ২১ দিনে যশোর জেলায় গণপিটুনিতে ছয় ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনই অভয়নগর উপজেলায় মারা যায়। বাকি একজনকে হত্যা করা হয় ঝিকরগাছা উপজেলায়।

মানবাধিকার কর্মীরা এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা হারিয়ে লোকজন এমন ঘটনা ঘটালেও এর মধ্য দিয়ে আরো বড় রকম বেআইনি কাজ করা হচ্ছে। এতে সামাজিক অস্থিরতা আরো বাড়বে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গতকাল নিহত ইলিয়াস শেখ অভয়নগর উপজেলার শুভরাড়া গ্রামের হাকিম শেখের ছেলে। গত কয়েক মাস ধরেই শুভরাড়া ইউনিয়নের মাঠপাড়া এলাকায় বেশ কিছু ভ্যান চুরির ঘটনা ঘটে। এ কারণে লোকজন রাতে টহলের ব্যবস্থা করে। শুক্রবার ভোররাতে গ্রামের টহলদল হাজি আছাদ ভূঁইয়ার বাড়ির সামনে ছিল। এ সময় একটি ব্যাটারিচালিত ভ্যানসহ ইলিয়াস শেখকে দেখলে তাদের সন্দেহ হয় এবং তাঁকে আটক করে।

স্থানীয়দের দাবি, একপর্যায়ে টহলদলের সঙ্গে ইলিয়াসের উত্তেজিত বাগিবতণ্ডা শুরু হলে এলাকাবাসী তাকে পিটুনি দেওয়া শুরু করে। পিটুনির একপর্যায়ে ইলিয়াস উপজেলার ঋষিপাড়া গ্রামের মুকুন্দর বাড়ি থেকে ভ্যানটি চুরি করেন বলে স্বীকার করেন। এরপর এলাকাবাসী ফের ইলিয়াসকে গণপিটুনি দিলে তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের সুন্দলীবাজারে গণপিটুনিতে নিহত হয় মামুন রশিদ (৩০) নামের এক ব্যক্তি। তিনি উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নের জিয়াডাঙ্গা গ্রামের সোবহান বিশ্বাসের ছেলে। মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের অভিযোগে তাঁকে গণপিটুনি দেওয়া হয়।

গত ১৩ জানুয়ারি  ভোররাতে প্রেমবাগ ইউনিয়নে প্রেমবাগ গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই রাতে যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের গাইদগাছি গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে খোরশেদ আলমের তিনটি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। চুরির ঘটনা টের পেয়ে গ্রামবাসী মাইকে ঘোষণা দিয়ে চোরদের দেড় কিলোমিটার ধাওয়া করে পাশের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ গ্রামের মজুমদারপাড়ায় ধরে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন খুলনার খানজাহান আলী থানার রেলগেট এলাকার সোহেল (২৭), সৈকত (৩০) ও জনি (৩০)। এ ঘটনায় পুলিশ বাগেরহাট জেলার কাটাখালী গ্রামের জনিকে আটক এবং চোরাই গরু ও গরু বহনের পিকআপ জব্দ করে।

গত ২৩ জানুয়ারি গণপিটুনিতে নিহত হন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামে ইলিয়াজ (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। এ সময় আব্দুল্লাহ (৩০) নামের এক ব্যক্তি আহত হন। ওই রাত দেড়টার দিকে উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের ইনসান আলীর বাড়ির তিনটি গরু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় ইলিয়াজ ও আব্দুল্লাহকে ধরে গণপিটুনি দেয় জনতা। পরে ইলিয়াজ মারা যান।

এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাইটস্ যশোরের নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, এটা বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানুষের নৈতিক অধঃপতনের কারণে এমন ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

যোগাযোগ করা হলে যশোর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, চুরির ঘটনায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়া এবং হুজুগের কারণে এসব গণপিটুনির ঘটে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার পর মামলা হয়। আমরা তদন্ত করে দেখি যে কারা মারছে। আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করি। গণপিটুনি বন্ধে আমরা প্রত্যেক থানাকে ইতিমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছি এলাকাবাসী সবার সঙ্গে কথা বলার জন্য।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা