kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

কঠোর বিধান আসছে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে

খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত
সিনথেটিক উপকরণ দিয়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইন নিষিদ্ধ হচ্ছে

ওমর ফারুক   

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অগ্নিনিরাপত্তা বিবেচনায় না রেখে ভবন নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আসছে। যারা ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়া ভবন বা ইন্টেরিয়র ডিজাইন করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য ফায়ার সার্ভিসে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ আইনের ওপর ভিত্তি করে এসংক্রান্ত একটি বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই এ বিধিমালা পাসের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, একটু সচেতন হলেই প্রাণহানি ও বিপুল সম্পদের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে এক লাখের বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে পুড়ে ছাই হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। কেবল গত বছরই আগুনে পুড়ে মারা গেছে শতাধিক লোক। ভয়ংকর কয়েকটি আগুনের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়নও সৃষ্টি করে।

এমন প্রেক্ষাপটে আগুন নেভাতে উন্নত যন্ত্রপাতি আনার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিধিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যুগোপযোগী একটি বিধিমালা তৈরি করেছি। বিধিমালা পাস হওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হবে।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, একটি বিধিমালা ২০১৪ সালে পাস হয়েছিল। কিন্তু সেটার ব্যাপারে গার্মেন্টের মালিকসহ বিভিন্ন সংস্থার তরফ থেকে আপত্তি আসে। পরে সেটা পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রণালয় পরামর্শ দেয়। এরপর নতুন এই বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ফায়ার সার্ভিস যাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারে সে জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি বিভাগে একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাখার পক্ষে ফায়ার সার্ভিস। ভবনের বৈদ্যুতিক তারের কী অবস্থা, সিনথেটিক উপকরণ ব্যবহার করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা হয়েছে কি না—সেগুলো দেখবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ছাড়া আগুন লাগলে ভবন থেকে বের হওয়ার অনুমোদিত রাস্তা আছে কি না—এমন বিভিন্ন বিষয়ও দেখবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এগুলোর ব্যত্যয় পেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভবন মালিকের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করতে পারবেন।

জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে বহুতল ভবনে আগুন লাগার প্রধান কারণ হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া সিনথেটিক উপকরণের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বলেও জানা গেছে। যে কারণে ইন্টেরিয়র ডিজাইন কিংবা সিলিং হিসেবে ব্যবহৃত সিনথেটিক উপকরণকে আগুনের খাবার হিসেবে অভিহিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা কোনো কক্ষে যদি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট ঘটে সঙ্গে সঙ্গে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।

ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলছেন, এসব বিষয় বিবেচনা না করেই লোকজন সিনথেটিক উপকরণ ব্যবহার করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, ৩০ বছর আগের একটি ভবনে বাল্ব বা ফ্যান চালানোর জন্য বৈদ্যুতিক লাইন টানা হয়েছে, কিন্তু এখন সেই লাইন দিয়ে কম্পিউটার, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার চালানো হচ্ছে। এতে করে বৈদ্যুতিক তার লোড নিতে পারছে না। ফলে শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। শুধু এই বিষয়টি যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে একজন ভবন মালিক সহজেই তাঁর ভবনকে আগুন থেকে নিরাপদ রাখতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। এ কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সিনথেটিক উপকরণ দিয়ে সিলিং ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন করার ব্যাপারে ভবন মালিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। বিধিমালা পাস হওয়ার পর এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

কী থাকছে ফায়ার সার্ভিসের বিধিমালায় : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একক বাড়ি, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট, মেস, বোর্ডিং হাউস, ডরমিটরি ও হোস্টেল, হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউস, রেস্টুরেন্ট ও ক্লাব হাউসে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিধিমালায় বেশ কিছু করণীয় রয়েছে।

বিধিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, সব প্লট ও ভবনে প্রবেশের জন্য প্রবেশপথ থাকতে হবে এবং আবাসিক বহুতল ভবনের সামনের প্রধান সড়ক কমপক্ষে ৯ মিটার প্রশস্ত হতে হবে। একই প্লটে একাধিক ভবন থাকলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি  প্রবেশের সুবিধার জন্য মূল প্রবেশপথে ফটকের উচ্চতা কমপক্ষে পাঁচ মিটার হতে হবে। ভবনে ‘ওয়েট রাইজার’ থাকতে হবে। প্রতি তলার ৬০০ বর্গমিটার ফ্লোর এরিয়ার জন্য একটি ও এর অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়ার জন্য আরো একটি রাইজার পয়েন্ট থাকতে হবে। স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার স্থাপন করতে হবে। পানি সরবরাহের জন্য ন্যূনতম ৫০ হাজার গ্যালন ধারণক্ষমতার ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার থাকতে হবে। রিজার্ভার থেকে পানি নেওয়ার জন্য ড্রাইভওয়ে থাকতে হবে।

বিধিমালার খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউস থাকতে হবে, যা তৈরি করতে হবে অগ্নিনিরোধক উপকরণ দিয়ে। স্মোক ও হিট ডিটেক্টর এবং এয়ার ডাম্পারের অবস্থান নকশায় চিহ্নিত করতে হবে। জরুরি নির্গমন সিঁড়ি থাকতে হবে, যা ফ্লোর প্ল্যানে উল্লেখ থাকবে। ভবনে ৫০০ জনের জন্য দুটি, এক হাজার জন পর্যন্ত তিনটি এবং এর বেশি লোক থাকলে চারটি সিঁড়ি রাখতে হবে। বিকল্প সিঁড়ি থাকতে হবে। একাধিক লিফটের একটি বা চারটির বেশি লিফটের দুটি ফায়ার লিফট হিসেবে নির্মাণ করতে হবে এবং সেটা নকশায় থাকতে হবে। আগুন, তাপ ও ধোঁয়ামুক্ত নিরাপদ এলাকা রাখতে হবে। এ ছাড়াও আরো অনেক বিষয় বিধিমালায় থাকছে বলে জানা গেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা