kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

‘গরিবের হোটেল রবিনহুড’

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

১২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘গরিবের হোটেল রবিনহুড’

টাঙ্গাইলে গরিব মানুষকে বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার খাওয়ান মির্জা মাসুদ রুবেল। ছবি : কালের কণ্ঠ

মর্জিনা বেগমের স্বামী টাঙ্গাইল শহরে পানের দোকান করতেন। কয়েক বছর আগে তিনি গত হয়েছেন। একমাত্র মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিনি নিজেও অসুস্থ। বেশ কিছুদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। শহরের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মর্জিনা বেগম আগে অন্যের বাসা-বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। এখন অসুস্থ হওয়ায় কাজ করতে পারেন না। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে চলেন। টাঙ্গাইল শহরের নিরালা মোড় শহীদ মিনার চত্বরে প্রতি শুক্রবার বিনা মূল্যে খাবারের আয়োজন করা হয় বলে শুনেছেন। তারপর থেকে প্রায়ই তিনি মেয়েকে নিয়ে সেখানে আসেন। সপ্তাহে অন্তত এক দিন একটু ভালো খাবার খাওয়া যায় এখানে। সেই তৃপ্তি পেতেই মর্জিনা বেগম এখানে আসেন।

শহরের রিকশাচালক জাহের মোল্লার (৪৭) সংসারে সদস্যসংখ্যা সাতজন। তিনি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জাহের মোল্লা বলেন, রিকশা চালাই। হোটেলে খেতে অনেক টাকা লাগে। একদিনে একবেলা ভালো খাওয়ায় এখানে। কোনো টাকা লাগে না। তাই এখানে আসি। যে মানুষ এ কাজ করেছেন, আল্লাহ তাঁর ভালো করবেন। আমাগো মতো গরিব মানুষরে বিনা পয়সায় খাওয়াচ্ছেন।

মর্জিনা, জাহেরের মতো রিনা আক্তার, দিলদার হোসেন, বাদশা মিয়াসহ শতাধিক গরিব মানুষ প্রতি শুক্রবার শহীদ মিনার চত্বরে দুপুরের খাবার খেয়ে থাকেন। তাঁদের জন্য বিন্যা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন টাঙ্গাইল শহরের নিরালা রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী মির্জা মাসুদ রুবল। তিনি এই আয়োজনের নাম দিয়েছেন ‘গরিবের হোটেল রবিনহুড’। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “ইউরোপের একটি হোটেলে বিনা মূল্যে গরিব মানুষদের খাওয়ানো হয়। সেই হোটেলের নাম ‘রবিনহুড’। আমিও তাই এই হোটেলের নাম রবিনহুড দিয়েছি।”

কেন গরিবের হোটেল রবিনহুড খুলে দরিদ্র, শ্রমজীবী, দুস্থ ও ভিক্ষুকদের বিনা মূল্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন—এর উত্তরে মির্জা মাসুদ রুবল বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষরা একসময় অসহায়, দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁদের আর্তমানবতার জন্য নানামুখী কর্মকাণ্ড দেখে এসেছি। অনাহারির মুখে একবেলা খাবার তুলে দেওয়ায় তাঁদের চোখে-মুখে যে আনন্দের ঝিলিক ফুটে ওঠে, তা আমাকে আপ্লুত করে। তাঁরা যখন পেট ভরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে, সেটা দেখে আমার মনটা ভরে যায়। তাই শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এ আয়োজনটা করে থাকি।’

টাঙ্গাইল শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, দরিদ্র, অসহায় খেটে খাওয়া শতাধিক মানুষ তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী সবার হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন। সময়মতো পানিও দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। তেমন কোনো হৈচৈ নেই। খাবার পাওয়ার জন্য কোনো হুড়োহুড়ি নেই। সবাই জানেন এখানে কাউকে না খেয়ে ফিরে যেতে হয় না। ‘গরিবের হোটেল রবিনহুড’ সত্যি গরিব মানুষের জন্য সপ্তাহে এক দিন বিনা মূল্যে খাবার তুলে দিচ্ছে। প্রায় আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলছে এ আয়োজন।

মির্জা মাসুদ রুবল জানান, শহরে ‘নিরালা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে তাঁর একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখান থেকে যা আয় হয় তার একটা অংশ দিয়ে চালান ‘গরিবের হোটেল রবিনহুড’। এই হোটেলে প্রথমদিকে প্রতিদিন দুপুরের খাবার খেত দুস্থরা। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখন সপ্তাহে এক দিন তাদের খাওয়ানো হয়। তবে ইচ্ছা আছে, ভবিষ্যতে আগের নিয়মে প্রতিদিন একবেলা করে তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার।

মির্জা মাসুদ রুবল বলেন, ‘এই হোটেলটি চালানোর জন্য কারো কাছে কখনো সাহায্য চাইনি। তবে কেউ যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে অবশ্যই তা গ্রহণ করা হবে। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন সাহায্য করার জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁদের কারো সাহায্য হাতে এসে পৌঁছেনি।’

মির্জা মাসুদ রুবলের এ উদ্যোগ ইতিমধ্যে টাঙ্গাইলে সাড়া জাগিয়েছে। টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারের সম্পাদক কবি ও অধ্যাপক মাহমুদ কামাল বলেন, মির্জা মাসুদ রুবলের উদ্যোগটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি গরিব মানুষদের মুখে ভালোমানের খাবার তুলে দিচ্ছেন। তিনি খুব বিত্তবান নন, তবে তাঁর মনটা বিত্তশালী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা