kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

প্রাথমিকে নতুন যুগে দেশ

স্কুলে স্কুলে রান্না করা গরম খাবার

শরীফুল আলম সুমন, টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) থেকে   

৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আগে থেকেই প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের রান্না করা খাবার দেওয়া হতো। আমাদের দেশেও আনুষ্ঠানিকভাবে সে যাত্রা শুরু হলো। এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। স্কুলেই শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা ও ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে রান্না করা খাবার। এতে থাকবে দৈনিক পুষ্টি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ ক্যালরি।

এ কার্যক্রমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিড ডে মিল’। গতকাল মঙ্গলবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ উপলক্ষে উপজেলার নিলফা বয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন। প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষা হবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে আরো উন্নত করে বিস্কুটের পরিবর্তে স্কুলের শিক্ষার্থীদের রান্না করা খাবার দেওয়ার কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। শিক্ষায় লক্ষ্য অর্জনে মা-বাবা ও শিক্ষকদের মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।’

শিক্ষকদের উদ্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সব সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু আপনারা আমাদের সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলবেন।’

সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেন, ‘মা হলেন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। আর শিক্ষক হলেন সন্তানের দ্বিতীয় মা। আমরা চাই মা আর শিক্ষকের সমন্বয়। তা না হলে মানসম্মত শিক্ষা হবে না।’

তিনি বলেন, ‘মিড ডে মিলের সবচেয়ে লাভজনক দিক হলো, ঝরে পড়া কমবে। শিক্ষার নান বাড়বে। গত ১ জানুয়ারি থেকে দেশের ১৬টি উপজেলায় মিড ডে মিল কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। আগামী বছর সারা দেশের স্কুলে কর্মসূচিটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।’

স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া খানম। তার বাবা চায়ের দোকানি, মা গৃহিণী। তিন ভাই ও এক বোনসহ পাঁচজনের সংসারে অনেক টানাটানি। সামিয়া জানায়, আগে সে স্কুলে টিফিন নিয়ে আসত না। মাঝেমধ্যে দোকান থেকে এটা-সেটা কিনে খেত। আবার টিফিন পিরিয়ডে বাড়ি চলে গেলে আর স্কুলে ফিরত না। এখন স্কুলে রান্না করা গরম খাবার দেওয়ায় তার আর চিন্তা নেই। 

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী টুম্পা খানম। তারা তিন বোন ও দুই ভাই। বাবা কাঠমিস্ত্রি। টুম্পা জানায়, সে কখনো স্কুলে টিফিন নিয়ে আসত না। দুপুরে ক্ষুধায় কষ্ট হতো। এখন আর খাবারের চিন্তা নেই।

গতকাল দুপুরে প্রথমবারের মতো রান্না করা খাবার পেয়ে খুব খুশি শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিতা নূর, ফাতেমা, প্রথম শ্রেণির রোহান, চতুর্থ শ্রেণির শুভংকর জানায়, আগে তারা বিস্কুট পেত। অনেকে তা খেত না। এখন খিচুড়ি দিলে সেটা তাদের কাছে বেশ আনন্দের হবে।

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জামিলার মা নার্গিস আক্তার জানান, খিচুড়ি দিলে বেশি লাভবান হবে মায়েরা। সকালে রান্না করার ঝামেলামুক্ত হবেন তাঁরা।

স্কুলের শিক্ষক লতিকা বিশ্বাস জানান, আগে অর্ধেক বাচ্চা স্কুলে আসার সময় খাবার নিয়ে আসত। টিফিনের সময় যেসব বাচ্চা বাড়িতে চলে যেত তারা আর স্কুলে ফিরত না। এখন স্কুলে গরম খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করায় সবার পড়ার প্রতি মনোযোগ বাড়বে।

দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় ২০০০ সাল থেকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চলছে। এর আওতায় শিশুরা পুষ্টিকর উন্নত মানের বিস্কুট পাচ্ছে। এখন বিস্কুটের পরিবর্তে রান্না করা খাবার দেওয়া হবে।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ৮৩টি স্কুল রয়েছে। এর মধ্যে গতকাল ৩৩টি স্কুলে চালু হয়েছে এই কার্যক্রম। শিগগিরই বাকি স্কুলগুলোতেও তা শুরু হবে।

সচিব বলেন, ‘সপ্তাহের তিন দিন সবজি খিচুড়ি এবং তিন দিন বিস্কুট দেওয়া হবে শিক্ষার্থীদের। প্রতিদিন প্রতিটি শিশুকে ৫৩৩ ক্যালরি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া হবে। যেদিন ডিম খিচুড়ি দেওয়া হবে সেদিন পাবে ৬৩০ ক্যালরি। আমরা চাই, শিশুদের আর যেন ক্ষুধা নিয়ে ক্লাস করতে না হয়।’

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সোহেল আহমেদ, প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন খান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ড. শহীদুজ্জামান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খান প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা