kalerkantho

বুধবার । ২২ জানুয়ারি ২০২০। ৮ মাঘ ১৪২৬। ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘স্বামী দেবর চইল্যা গেল, এখন অন্তত ভাইডা বাঁইচা থাক’

কেরানীগঞ্জের আগুনে দগ্ধ আরো ৫ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘স্বামী দেবর চইল্যা গেল, এখন  অন্তত ভাইডা বাঁইচা থাক’

কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে দগ্ধ স্বামী আব্দুর রাজ্জাক, দেবর আলম আর ভাই ফিরোজকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এসেছিলেন গুলশান আরা বেগম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আগেই দেবর আলমের মৃত্যু হয়। এরপর গতকাল স্বামী আব্দুর রাজ্জাকও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেই দুঃসহ কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। গুলশান আরা আহাজারি করে বলছিলেন, ‘আমার কপালে সুখ সইলো না। স্বামী মইরা গেল, দেবর আগেই চইল্যা গ্যাছে, এখন অন্তত ভাইডা বাঁইচা থাক।’ ঢামেকের শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে গতকাল রবিবার দুপুরের দৃশ্য এটি।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার প্লাস্টিক কারখানার আগুনে দগ্ধদের মধ্যে গতকাল আব্দুর রাজ্জাকসহ আরো পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আব্দুর রাজ্জাক (৪৫), আবু সাঈদ (১৬), মোসতাকিন (২২) নামের তিনজন। আর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সুমন হাওলাদার (২০) নামের আরেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া দুর্জয় দাস (১৮) নামের একজন কেরানীগঞ্জের নিজ বাসায় সন্ধ্যা ৭টার দিকে মারা যায়। রাজ্জাক ও দুর্জয়ের বাড়ি কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায়। মোসতাকিনের বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলায় এবং সাঈদের বাড়ি টঙ্গিবাড়ীর উত্তর রায়পুরায়। সুমন বরিশাল সদর উপজেলার মোসলেম হাওলাদারের ছেলে। তিনি কেরানীগঞ্জের হাবিবনগর এলাকায় থাকতেন। দুর্জয় ঘটনার পর ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি ছিলেন। তবে এক রাত হাসপাতালে থাকার পর পরিবারের লোকজন আশঙ্কাজনক জেনেও তাঁকে বাসায় নিয়ে যায়। এ নিয়ে গত চার দিনে এ ঘটনায় ১৯ জন মারা গেলেন বলে জানিয়েছেন বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অল্প সময়ের ব্যবধানে পর পর মৃত্যুর খবরে বার্ন ইউনিটের আইসিইউর সামনের বারান্দায় কান্নার রোল পড়ে গেছে স্বজনদের। বার্ন ইউনিটের বারান্দায় অনেকটা নির্ঘুম অবস্থায় চার দিন ধরে অবস্থানরত মোসতাকিনের মা রোকেয়া বেগম জানান, তাঁর স্বামী অনেক আগে মারা গেছেন। গৃহকর্মীর কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে মোসতাকিন ছিল ছোট। ছেলের টাকায় সংসার চলত। উদ্ভ্রান্তের মতো তিনি সামনে পাওয়া একে-ওকে প্রশ্ন করছিলেন, ‘এখন কী করে বাঁচব? ছেলেটা আর আমাকে মা বলে ডাকল না!’ এ সময় পাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ভাই আলমগীর। ‘এই ক্ষতি কিভাবে মেনে নেওয়া যায়...’ বলে আলমগীর হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

দুর্জয় দাসের পেশায় গাড়িচালক বাবা মিন্টু দাস বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ছেলে আমাগো ছাইড়া চিরদিনের জন্য চইলা গেল।’ তিনি জানান, দুর্জয় মালপত্র লোড-আনলোডের কাজ করতেন। কারখানার পাশেই তাঁদের বাসা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

গত ১২ ডিসেম্বর থেকে কেরানীগঞ্জের ভয়াবহ আগুনে দগ্ধদের স্বজনের ভিড় বার্ন ইউনিটের সামনে। দুঃসহ যন্ত্রণায় তাদের দিন কাটছে। জানতে চাইলে বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মারা যাওয়া পাঁচজনই অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তাঁদের শরীরের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দুর্জয় দাসকে হাসপাতালে না রেখে স্বজনরা বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। এরা মারা যাওয়ার পর এখনো পাঁচজন লাইফ সাপোর্টে আছেন। এর বাইরে বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছেন আরো আটজন। তাঁদের অবস্থা তুলনামূলক কিছুটা ভালো।’ উল্লেখ্য, গত বুধবার (১১ ডিসেম্বর) চুনকুটিয়ার প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিদগ্ধ শ্রমিকদের মধ্যে ৩১ জনকে ঢামেক হাসপাতালের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাঁদের ১৪ জন এর আগেই মারা গেছেন। রবিবার আরো পাঁচজনের মৃত্যু হলো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা