kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

কেরানীগঞ্জে আগুন

‘ভাই, তোমাদের জন্য কিছু করে যেতে পারলাম না’

দোয়া চেয়ে বিদায় নিচ্ছেন একের পর এক অগ্নিদগ্ধ

ওমর ফারুক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘ভাই, তোমাদের জন্য কিছু করে যেতে পারলাম না’

কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ভাই, তোমাদের জন্য কিছু করে যেতে পারলাম না। আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকেই তোমাদের জন্য কিছু করব বলে ভাবছিলাম; কিন্তু পারলাম না। আমার জন্য তোমরা দোয়া করো।’ গত বুধবার রাতে বড় ভাইকে কাছে পেয়ে অগ্নিদগ্ধ যুবক বাবলু (২৬) কাঁদতে কাঁদতে এ কথাগুলো বলছিলেন। এ সময় তাঁর পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল। রাত ১০টার দিকে এসব কথা বলার পর রাত ২টায় তিনি চলে যান না-ফেরার দেশে। শুধু বাবলুই নন, তাঁর মতো আরো ১২ জন মারা গেছেন গত দুই দিনে। অন্য যে ১৮ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন, তাঁদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। অন্য যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের স্বজনরাও জানিয়েছে, বার্ন ইউনিটে স্বজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাঁরা সবাই দোয়া চেয়েছেন। তাঁরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে মারা যাচ্ছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন কেউ কেউ তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে শেষবিদায় নেওয়ার পর থেকে আর কথা বলার সুযোগ পাননি।

গত বুধবার বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকার প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাবলুর বড় ভাই আমির হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বেলাব থানার বিন্নাবাইট গ্রামে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বাবলুর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ঢাকা পলিটেকনিক থেকে ইলেকট্রিক বিভাগে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। এরপর তিনি একটি কারখানায় কাজ করছিলেন। গত ৭ ডিসেম্বর যোগ দেন এ প্লাস্টিক কারখানাটিতে। আর তিন দিন পেরোতে না পেরোতেই আগুনে পুড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হলো তাঁর। আমির হোসেন জানান, তাঁরা গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। হঠাৎ করে বুধবার সন্ধ্যায় একটি ফোন পান তিনি। বাবলু ঢামেক হাসপাতালে দায়িত্বরত একজন আনসার সদস্যকে তাঁর ভাই আমির হোসেনের মোবাইল নম্বর দিয়ে ফোন করতে বলেন। ওই আনসার সদস্য আমিরকে জানান, তাঁর ভাই অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে এক আত্মীয়কে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালের উদ্দেশে রওনা হন। রাত ১০টার দিকে এসে পৌঁছান। এসে দেখতে পান বার্ন ইউনিটে তাঁর ভাইয়ের সারা শরীর ব্যান্ডেজ করা। বড় ভাইকে কাছে পেয়ে কান্না শুরু করেন বাবলু।

গতকাল দুপুরে মর্গের সামনে আমির হোসেনকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। তখন বাবলুর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কাটা ঘরে রাখা ছিল। আমির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শেষ কথাগুলো কী করে ভুলব। ওর সঙ্গে যে অনেক কথা ছিল; কিন্তু বলতে তো পারলাম না। আমার ভাই যখন বলল, আমাদের জন্য সে কিছু করে যেতে পারেনি। আমি তখন বলি, তুই ছোট ভাই, তুই কী করবি আমাদের জন্য। তুই চিন্তা করিস না, ভালো হয়ে যাবি। সেই ভাই আর ভালো হলো না। পুরো স্বপ্ন-সাধ ধ্বংস করে দিল আগুন।’

বিকেলের দিকে মর্গের সামনে কাঁদতে কাঁদতে এদিক-ওদিক ছোটোছুটি করতে দেখা যায় দরিদ্র এক ব্যক্তিকে। জানা গেল তাঁর নাম খলিল দেওয়ান, বাড়ি বরিশালের হিজলায়। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। ছেলেদের মধ্যে সোহাগ (২৬) ও সুজন (১৯) ওই প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতেন। দুজনই অগ্নিদগ্ধ হন। এরই মধ্যে সুজন মারা গেছেন। আর সোহাগকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। তিনি বাঁচবেন কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। দুই ছেলের অগ্নিদগ্ধের খবর পেয়ে রিকশাচালক হতদরিদ্র বাবা মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থেকে ছুটে আসেন ঢাকা মেডিক্যালে। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দুই চোখ লাল টকটকে হয়ে আছে। দুইবার মূর্ছাও গেছেন। সোহাগের মামা কামাল হোসেন বলেন, ‘তাঁরা (সোহাগ-সুজনদের পরিবার) এতটাই দরিদ্র যে বরিশালের বাড়িতে ভিটা ছাড়া কিছু নেই। ফলে কবর দেওয়ার জায়গা না থাকায় সুজনের লাশ নিয়ে যেতে এসেছি আমরা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে মামার বাড়ির কবর স্থানে তাঁর দাফন করা হবে।’

তিনি আরো জানান, সোহাগের চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বাবার সঙ্গে তাঁর খুব ভাব। বাবার জন্য সে কান্নাকাটি করছে। অবুঝ শিশুকে কোনো কিছু দিয়েই বোঝানো যাচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘একই পরিবারের দুই ভাই এমন ঘটনার শিকার হয়েছে, তাদের মা-বাবা কী সান্ত্বনা নিয়ে বাঁচবেন এখন।’ তিনি জানান, সোহাগ এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকলেও সেও বুধবার রাতে তাঁদের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে বিদায় নিয়েছে। এখন তাঁরা দোয়া করছেন আল্লাহ অন্তত সোহাগকে যেন বাঁচিয়ে রাখেন।

শুধু তাঁরাই নন, গতকাল মর্গের আশপাশে মৃত প্রত্যেকের পরিবারের লোকজনের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। এর সঙ্গে ছিল লাশ কাটা ঘর থেকে কখন বুঝে পাবেন স্বজনের লাশ, সেই প্রতীক্ষা। এমন নির্মম প্রতীক্ষা আসলে স্বেচ্ছায় কোনো মানুষই করতে চায় না।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা