kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

রোহিঙ্গা সংকট

জবাবদিহি উদ্যোগে অগ্রগতি উল্টো চিত্র প্রত্যাবাসনে

মেহেদী হাসান   

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগে বড় অগ্রগতি হলেও বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে। গত দুই সপ্তাহে রোহিঙ্গা নিপীড়নের জন্য দায়ী ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জেনোসাইডের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। জাতিসংঘের আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে গাম্বিয়া। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জেনোসাইড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে আর্জেন্টিনায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচার সমর্থন করে একটি প্রস্তাব দিয়েছে।

অন্যদিকে গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফায় উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর প্রত্যাবাসন কবে নাগাদ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গা নিপীড়নের জবাবদিহিতা ও প্রত্যাবাসন—দুই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জবাবদিহিতার উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলেও প্রত্যাবাসন শুরু করার ব্যাপারে অগ্রগতি হচ্ছে না।

মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে না বলে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা প্রত্যাবাসনের যেকোনো উদ্যোগ স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থানও এর চেয়ে ভিন্ন নয়। এ জন্য বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে মিয়ানমারে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০১৭ সালের আগস্টের পর মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্য থেকে সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর এখন সেখানে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর লড়াই চলছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গনার গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফর করেছেন। সে সময় তিনি রাখাইনও সফর করেন। তিনি রাখাইনে ‘আরাকান আর্মি’র সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর সংঘাত বন্ধ করতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাধাগুলো চিহ্নিত করতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গড়ার সিদ্ধান্ত হয়। গত অক্টোবরে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মহাপরিচালক এবং মিয়ানমার ও চীনের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে ওই ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গত বুধবার ঢাকায় চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে আলাদাভাবে ডেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা চেয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা একজনও বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী নন। তাঁরা নাগরিকত্ব, জবাবদিহিতাসহ বিভিন্ন দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জন্য আইন পরিবর্তনে আগ্রহী নয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশই যেখানে মনে করছে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো অনুকূল পরিবেশ মিয়ানমারে নেই, সেখানে মিয়ানমার বলছে যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেছেন, অন্তত একটি বিষয় সবাই বুঝতে পারছে যে ৪১ বছরের পুরনো সংকটের রাতারাতি কোনো সমাধান নেই। দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

মন্তব্য