kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পুটখালী সীমান্তে গরুর আড়ালে অস্ত্র কারবার

নদীতে গোসল করা চোরাকারবারিদের কৌশল

এস এম আজাদ   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যশোরের বেনাপোলের পুটখালী গ্রামের সীমান্ত দিয়ে গরুর ব্যবসার আড়ালে ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ করে’ এলাকার প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে অস্ত্র কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। ম্যানেজে সমস্যা হলে এক পক্ষ আরেক পক্ষের চালান ধরিয়ে দেয়। এই পথের (রুট) অস্ত্র কারবারিরা ভারতের বিহার থেকে অস্ত্র ও গুলি প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিয়ে আসে। পরে সেই অস্ত্র কলকাতা শহরের উত্তর-পূর্ব দিকের জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী আংরাইল গ্রাম এবং পুটখালীর মধ্যে থাকা ইছামতী নদী দিয়ে বাংলাদেশের কারবারিদের কাছে পাচার করে। নদীতে গোসল করার ছলে নেমে অস্ত্র হাতবদল করে তারা।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার পুটখালীর এক অস্ত্র কারবারিকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য শাখা (ডিবি)। হাফিজুর রহমান বিশ্বাস নামের ওই কারবারি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরেই পুটখালী সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানের তথ্য মিলেছে। ভারতের অস্ত্র কারবারিরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ বন্দরের পাশাপাশি পুটখালীকে বেছে নিয়েছে।

গত ৪ নভেম্বর রাতে মিরপুরের কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে থেকে পুটখালীর আমির বিশ্বাসের ছেলে হাফিজুর রহমান বিশ্বাস একটি পিস্তল, দুটি রিভলবার, একটি শ্যুটার গানসহ গ্রেপ্তার হন। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের নির্দেশে হাফিজুরকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। রিমান্ডের দ্বিতীয় দিনেই হাফিজুর মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ডিবির সূত্র জানায়, হাফিজুরের পরিবার পুটখালী এলাকায় প্রভাবশালী। তাঁর আত্মীয়রা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। হাফিজুর আগে গরু ও মাদক চোরাকারবারে জড়িত ছিলেন। সাত মাস আগে তিনি অস্ত্রের কারবারে নামেন। এরই মধ্যে অন্তত ২০টি অস্ত্র বাংলাদেশে এনে বিক্রি করেছেন।

ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, সহযোগী হাবিবুর রহমান বিশ্বাস ও জিল্লুর রহমানের সহায়তায় হাফিজুর ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিয়ে আসেন। হাবিবুর বেনাপোল এলাকার ইউপি সদস্য (মেম্বার)। অস্ত্র ও গুলি বিহার থেকে এনে কলকাতার সীমান্ত এলাকায় গোপন স্থানে রাখা হয়। দরদাম চূড়ান্ত হলে উত্তর চব্বিশ পরগনার আংরাইল ও বেনাপোলের পুটখালীর নদীতে গোসলের ছলে হাতবদল করা হয়। হাবিবুরের মাধ্যমে উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগ্রামের জাহাঙ্গীর নামে এক কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ হয় হাফিজুরের। জাহাঙ্গীর প্রতিটি অস্ত্রের জন্য ৩০ হাজার করে টাকা নেন। এসব অস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে বিক্রি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিসহ নানা ধরনের নাশকতামূলক বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ব্যবহার করা হয়।

এদিকে আমাদের বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, হাফিজুর রহমানের পরিবার দাবি করছে, তিনি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন। হাফিজুরের বড় ভাই পল্লী চিকিৎসক আব্দুর রহমান বলেন, হাফিজুরকে গত ২৮ অক্টোবর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মোবাইল ফোনে ডেকে বেনাপোল পর্যটন মোটেলে নেওয়া হয়। এর পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধন ছিল। হাফিজুর সাধারণ একজন গরু ব্যবসায়ী।

ঢাকার ডিবি পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েক বছর ধরেই বেনাপোল ও পুটখালী দিয়ে অস্ত্র পাচারের চক্র ধরা পড়ছে। ভারতীয় নাগরিক জাহাঙ্গীর, খায়রুল ইসলাম মণ্ডল, বাংলাদেশি বাদশাহ মল্লিক, আলাউদ্দিন আলা, হাবিবুর, জিল্লুর, জনি দেউড়িসহ কয়েকজন সিন্ডিকেট চালায়। বাদশার বাড়ি বেনাপোলের বারোপাতায় এবং আলার বাড়ি বেনাপোলের রঘুনাথপুরে।

ঢাকার গেণ্ডারিয়ার জসিম, লোকমান, জাবেদসহ কয়েকজন ক্রেতার নামও জেনেছে ডিবি। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার গাবতলী থেকে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৫ রাউন্ড গুলিসহ খায়রুলকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তিনি পুটখালীতে বসবাস করলেও উত্তর চব্বিশ পরগনার উপান নগরের সাতবাড়িয়া সুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা। শরিফুল ইসলাম মণ্ডল নামে বাংলাদেশি সেজে জন্ম নিবন্ধন সনদও সংগ্রহ করেন খায়রুল। পুটখালীতে তিনি বিয়েও করেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা