kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

মাঠে পাঁচ তদন্তদল

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের ক্ষতি বলা হচ্ছে ১২ লাখ টাকা!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘বিকট শব্দ হওয়ার পর পরই ট্রেনটি কাত হয়ে যায়। এরপর চারদিক অন্ধকার। বেশ কিছু সময় ভেতরেই আটকে ছিলাম। একটু আলোর মতো দেখতে পেয়ে বের হয়ে আসি। একসময় দেখি যাত্রীরা ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ছে। ট্রেন থেকে বের হয়ে আহত অবস্থাতেই ফোন করে বাড়ি থেকে চিকিৎসার জন্য বিকাশে এক হাজার টাকা আনি। এরপর আর কিছুই বলতে পারি না। স্থানীয় লোকজন অ্যাম্বুল্যান্সে করে আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে আসে।’ পেছনের তিন বগি দুমড়ে যাওয়া উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ওই সুব্রত চক্রবর্তী (৪০)। মৃত্যু কেমন হয়! খুব কাছ থেকে যেন দেখেছেন তিনি। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের বেডে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল তাঁর।

গতকাল বুধবার দুপুরে সুব্রত জানান, বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্বও তাঁর। চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি কম্পানিতে তিনি চাকরি করেন। আহত হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে সংসার নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার বিভীষিকা সুব্রত চক্রবর্তীর মতো উদয়নের অনেক যাত্রীই ভুলতে পারছেন না।

এদিকে কসবার মন্দবাগ রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া ট্রেন দুর্ঘটনা তদন্তে কাজ শুরু করেছে পাঁচটি তদন্তদল। এর মধ্যে একাধিক দল গতকাল বুধবার ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। চালকের ভুলের পাশাপাশি তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনে কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না সেটি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন।

গতকাল বুধবার বিকেলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তদন্তদল মন্দবাগ আসেন। তাঁরা আউটার ও হোম সিগন্যালে কোনো ত্রুটি ছিল কি না সে বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখেন। তিনি বলেন, তদন্ত করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আরেকটি তদন্ত কমিটির প্রধান বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (পূর্ব) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ভোরের সময়টাতে পরিস্থিতি কেমন সেটা আমরা ঘুরে দেখেছি। দুর্ঘটনার ১০টি কারণ প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে একটি কারণ চিহ্নিত করে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’ চালকের ভুলের পাশাপাশি, সিগন্যালের ত্রুটি, আবহাওয়াজনিত কারণ এসবের মধ্যে রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন গঠিত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মিতু মরিয়ম বলেন, ‘আমরা প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকার লোকজন, স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তারা যেসব কারণ বলছে, সেগুলোকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব।’

প্রযুক্তির ব্যবহার : দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ মূলত শনাক্ত করে তাঁদের স্বজনরা। তবে পরিচয় জানতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রথমে তারা বায়েক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে রাখা লাশের আঙুলের ছাপ নেয়। সেই ছাপ সার্ভারের মাধ্যমে নিহতের নাম-ঠিকানা বের করার চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে সবার নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়।

এদিকে দুর্ঘটনার পর পরই ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিস্তারিত জানান গোলাম রাব্বানী নামের এক ব্যক্তি। হবিগঞ্জ জেলা সদরের রাজানগর এলাকার বাসিন্দা গোলাম রাব্বানী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে করে যাচ্ছিলেন। তিনি সামনের বগিতে ছিলেন। ৯৯৯ এ কল করার পর গোলাম রাব্বানীকে কনফারেন্সের মাধ্যমে কসবা ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। এর পরই ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের লোকজন।

গত সোমবার গভীর রাতে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথার সঙ্গে চট্টগ্রাম অভিমুখী উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে ১৬ যাত্রী নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক যাত্রী।

অপমৃত্যু মামলা : ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) হয়েছে। মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার জাকের হোসেন চৌধুরী গত মঙ্গলবার রাতে মামলাটি করেন।

ট্রেনের ক্ষতি ১২ লাখ টাকা! : দুর্ঘটনায় উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের দুটি বগি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে প্রায় ১১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে রেলওয়ে কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (পথ) মো. লিয়াকত আলী দাবি করেছেন। এ ছাড়া প্রায় ১৫০ ফুট রেললাইন সরে গিয়ে ও ক্লিপ খুলে প্রায় ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। তবে তূর্ণা নিশীথার লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) ক্ষতির বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া একটি বগি দুর্ঘটনাস্থলের পাশেই পড়ে রয়েছে।

এদিকে ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের পাশাপাশি দুই ট্রেনের চালক, পরিচালক ও মন্দবাগ স্টেশন মাস্টারকে ডেকেছে রেলওয়ের তদন্ত কমিটি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা