kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সাহিত্য মেলার যবনিকা

নওশাদ জামিল   

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাহিত্য মেলার যবনিকা

ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপনী দিনে সেমিনারে কথা বলেন বিদেশি অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজধানীতে দিনভর ছিল ঝিরঝির বৃষ্টি। মেঘলা দিন আর বৃষ্টির চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে গতকাল শনিবার অনেকেই সমবেত হয়েছিল লিট ফেস্টের নানা অধিবেশেনে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপনী দিন ছিল গতকাল। প্রকৃতির বিমতাসুলভ আচরণের জন্য উৎসবে খানিকটা ছন্দপতন হলেও আগ্রহের কমতি ছিল না নানা শ্রেণির মানুষের। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, নাটক, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে ছিল মনোজ্ঞ আলোচনা। ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে এবারের মতো পর্দা নামল এ উৎসবের। আয়োজকরা আশা করেন, আগামী বছর আরো বড় পরিসরে দশম ঢাকা লিট ফেস্ট দ্যুতি ছড়াবে। উৎসব উৎসর্গ করা হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

গতকাল আয়োজন শেষ হয় দক্ষিণ ভারতীয় সাংবাদিক তিশানি দোশির আবৃত্তি ও নৃত্যনাট্য দিয়ে। এরপর বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, উৎসব পরিচালক সাদাফ সায্? ও ব্রাজিলিয়ান লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বেসো লেপেস্কি।

এর আগে তৃতীয় দিনের সকালটা শুরু হয় ইসকনের সংগীত দলের ভজন কীর্তন দিয়ে। এরপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয় সকাল ১০টার সেশনগুলো। সকালে নজরুল মঞ্চে একটি শিশুতোষ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ‘সাগর তীরে’ নামের বইটির উন্মোচনের পর লেখক নাজিয়া জেবীন বই থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান। উন্মোচনের সময় বইটির প্রকাশক মিতিয়া ওসমান এবং মুদ্রণকারী মৌমিতা শিকদার উপস্থিত ছিলেন। একই মঞ্চে পরে ‘দি এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ বইয়ের লেখক নন্দিতা খান বইটি থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান।

পরে আবারও একই মঞ্চে ওঠেন কার্টিস জবলিং। তিনি শিশুদের বিভিন্ন শব্দজট ও ছবির মাধ্যমে নানা জিনিস শেখান। কয়েকটি গল্পের সঙ্গে অভিনয় করেও দেখান। এ সময় শিশুরাও তাঁর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেয়। তিনটি সেশেনেই শিশুদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

পাশাপাশি বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে ‘পাওয়ার অব পিকচার’ সেশনে উপস্থিত ছিলেন গ্রাফিক নভেলিস্ট ও কার্টুনিস্ট ফাহিম আঞ্জুম এবং চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা আবরার আখতার। সঞ্চালক ছিলেন কার্টুনিস্ট সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়।

আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটরিয়ামে পুলিত্জার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জেফরি গেটেলম্যান তাঁর বই ‘লাভ, আফ্রিকা : আ মেমোয়ার অব রোমান্স, ওয়ার অ্যান্ড সারভাইভাল’ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। ‘লাভ, আফ্রিকা’ শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন জাফর সোবহান।

জেফরি গেটেলম্যান বলেন, আফ্রিকা থাকাকালীন তাঁর ১০ বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস এ বই। তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসের পূর্ব আফ্রিকা বিষয়ক ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। কলেজে থাকার সময়ও তিনি কখনো সাংবাদিক হবেন এমনটা ভাবেননি। হঠাৎ করে আফ্রিকায় চলে যাবেন। চাকরির জন্য তাঁর কলেজজীবনের প্রেমিকার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরে সেই প্রেমিকাকেই বিয়ে করে তিনি আফ্রিকায় পাড়ি জমান।

জেফরি গেটেলম্যান আরো বলেন, ‘আফ্রিকায় পরিবারসহ থাকাটা সব সময় নিরাপদ ছিল না। সোমালিয়ায় যেকোনো মুহূর্তে অপহরণ হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু আমার স্ত্রী এবং আমি আমাদের পুরো সময়টাতে নিউ ইয়র্কের নাগরিক জীবনের বাইরে প্রাকৃতিক জীবন উপভোগ করেছি, মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের জীবন বোঝার চেষ্টা করেছি।’

সকালে সবচেয়ে জমজমাট আলোচনা ছিল ভারতীয় রাজনীতিক শশী থারুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সি আর আবরারের আলাপ। লেখক শশী থারুরের বই নিয়ে আলাপ করার পরিকল্পনা থাকলেও সেটি গড়ায় কাশ্মীর, মোদি ও রামমন্দির ইস্যুতে। কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী? দর্শক সারি থেকে ওঠা এমন প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেসের এই নেতা বলেন, ‘আমি জানি না আপনারা কাশ্মীর ইস্যুতে লোকসভায় আমার ভাষণ শুনেছেন কি না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটা কোনো পন্থা হতে পারে না। এ রকম পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘরবন্দি করে রাখা গণতন্ত্রে একধরনের অগ্রহণযোগ্য চর্চা।’

এ সময় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত হয় ‘সাহিত্য ও সাংবাদিকতা : দ্বৈতসত্তার মিল-অমিল’ শীর্ষক আলোচনাসভা। এতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কবি সাজ্জাদ শরীফ এবং সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কবি মুস্তাফিজ শফি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নিউজটোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহ্নাজ মুন্নী।

আলোচনায় মৃদুল দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমি কবিতাকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়াই না। আমি মাথা দিয়ে সাংবাদিকতা করি এবং বুক ও মাথা দিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গে যারা লেখালেখি করে তাদের একবার হলেও বাংলাদেশে ঘুরে যাওয়া উচিত। আর বাংলাদেশের যারা লেখালেখি করে তাদেরও পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে ঘুরে আসা উচিত। বাংলাদেশ কবিতার আবাদক্ষেত্র।’

এ সময় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে ‘অন দ্য রোড : ট্রাভেল রাইটিং উইথ উইলিয়াম ড্যালরিম্পল’ শীর্ষক সেশনে ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ড্যালরিম্পল বলেন, গত শতকের নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকের গোড়ার দিকে প্রায় ২৫ বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের পর এখানকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র্য তাঁকে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

বিকেল ৩টায় ফেরদৌসী মজুমদার ও রামেন্দু মজুমদার আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মঞ্চে বসেন জীবন ও পেশার গল্প নিয়ে। সেশনটি সঞ্চালনা করেন নাট্যকার ও শিক্ষক আব্দুস সেলিম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা