kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র

২০০ আসনে হাজার নিবাসীর বাস

৪১ বছরেও নিয়োগ হয়নি চিকিৎসক

মো. মাহবুবুল আলম, টঙ্গী (গাজীপুর)    

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সন্ধ্যার পরপরই শুরু হয় মেঝেতে বিছানা পেতে জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা! কার আগে কে ঘুমানোর একটু জায়গা কবজায় নেবে—এ নিয়ে চলে ধাক্কাধাক্কি, টানাটানি, গালাগাল আর মারামারি। টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (জাতীয় কিশোর সংশোধনী প্রতিষ্ঠান) এমন ছবি নিত্যদিনের। ২০০ আসনের এ কেন্দ্রে বর্তমানে নিবাসীর সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। প্রতিদিন গাদাগাদি করে তাদের ঘুমাতে হয়। ঘুমানোর জায়গা না পেয়ে স্টিলের খাট দখলে নিতে হয় মারামারি। এ কারণে সরিয়ে ফেলা হয়েছে সব খাট। লেখাপড়া, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থসেবা, বিনোদনসহ অন্য সব বিষয়েও একই হাল। দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় ভুগছে কেন্দ্রটি। সংশোধনী কার্যক্রমে নিয়ে আসা কিশোরদের মৌলিক চাহিদাগুলোই ঠিকমতো পূরণ হচ্ছে না, সংশোধন হবে কী—এ প্রশ্ন অভিভাবক মহলে।

সময়ের প্রয়োজনে কেন্দ্রের জনবল কাঠামো পরিবর্তন ও সম্প্রসারণ জরুরি হলেও প্রতিষ্ঠাকালীন অর্গানোগ্রাম অনুসারে জনবল এখনো অপরিবর্তিত। ২৩ পদ এখনো শূন্য। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কাজে রয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা।

কিশোর মন থেকে অপরাধপ্রবণতা দূর করে সংশোধনের মাধ্যমে শিশু-কিশোরকে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ১৯৭৮ সালে যে প্রতিষ্ঠানের জন্ম, দীর্ঘ ৪১ বছরেও সেই প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন হয়নি। বাড়ন্ত কিশোরদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অতি জরুরি হলেও স্বাস্থ্যসেবা বলতে এখানে নেই কিছুই। কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এখানে চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। তাদের চিকিৎসায় একজন কম্পাউন্ডারই ভরসা।

সম্প্রতি এখানে শুভ নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়, যার রোগের কারণই জানা যায়নি। কর্তৃপক্ষ বলেছে জ্বরে সে মারা গেছে। তবে সহপাঠীদের অভিযোগ, চিকিৎসা অবহেলাই তার মৃত্যুর কারণ। এই কেন্দ্রে জনপ্রতি মাসিক চিকিৎসাসেবা বাবদ ১০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও জরুরি অথবা প্রাথমিক চিকিৎসায় কোনো কিশোরকে কেন্দ্র থেকে কোনো ওষুধ সরবরাহ করা হয় না। কোনো কিশোর খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নেওয়া হয় টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে। সেই হাসপাতালে আবার প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেই।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন মামলার অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সের কিশোরদের। প্রতিদিনই নির্ধারিত ৩৩ জেলা থেকে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত কিশোরদের এখানে এনে ভর্তি করা হয়। তাদের জন্য এখানে শুধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ কেন্দ্রে হত্যা মামলার শতাধিক অভিযুক্ত কিশোর নিবাসীসহ বিচারাধীন ৮১০ জন ও সাজাপ্রাপ্ত সংশোধন কার্যক্রমের অধীন ১২৬ জন রয়েছে, যাদের অনেকেই উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও এখানে তাদের শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অবস্থানরত কিশোরদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ বলতে রয়েছে কাঠমিস্ত্রির কাজ, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির কাজ, দর্জির কাজ ও অটোমোবাইল। অটোমোবাইল বিষয়ক কোনো যন্ত্রপাতি, যেমন—গাড়ির বডি এবং ইঞ্জিনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি না থাকায় এ বিষয়গুলোতে কোনো প্রশিক্ষণার্থী নেই।

কিশোরদের প্রতিদিনের এক বেলা খাবার জ্বালানিসহ বরাদ্দ প্রায় ২৭ টাকা। এতে বাড়ন্ত কিশোরদের চাহিদানুসারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্পন্ন খাবার পর্যাপ্ত না হওয়ায় অভিভাবকদের বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে দেখা যায়। গত মঙ্গলবার ভোর থেকে কেন্দ্রের গেটে গিয়ে দেখা যায়, বহু অভিভাবক টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে অপেক্ষায় আছেন কখন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেবেন।

ঢাকার কল্যাণপুর থেকে এসেছেন মিনারা খাতুন, বললেন ওদের খাবারে ছেলের পেট ভরে না। গরুর মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছি। ছেলেটা মাংস দিয়ে ভাত খেতে চায়। কেরানীগঞ্জের জসিম উদ্দিন বললেন, সংশোধন হবে কী? ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, খেলতে পারে না, খেতে পারে না। বড়-ছোট শুধু মারামারি। লেখাপড়া নেই, শুধু হৈচৈ। কিশোর মনকে ভুলিয়ে রাখার মতো কোনো আকর্ষণীয় ব্যবস্থা নেই। এটা জেলখানার মতোই। এই কেন্দ্র অত্যাধুনিক করে সাজানো দরকার।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক এহিয়াতুজ্জামান বলেন, ‘কেন্দ্রের বড় সমস্যা হলো যানবাহন। এখানে যানবাহন বলতে শুধু একটি দীর্ঘদিনের পুরনো মাইক্রোবাস, যা প্রায় অকেজো। জরুরি প্রয়োজনে নিবাসীদের নিয়ে যেতে হয় প্রাইভেট বাসে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হওয়ার পর অপরাধী কিশোরদের বিভিন্ন আদালতে নেওয়ার সময় মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পুলিশি স্কট পাওয়া যাচ্ছে না। আর এ কারণে বিভিন্ন জেলায় সংশ্লিষ্ট মামলার কাজে অভিযুক্ত কিশোরদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই আদালত থেকে অহরহ শোকজ নোটিশ আসছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা