kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

সমন্বয়হীনতার সুযোগে পণ্য ছাড়ে জালিয়াতি

চট্টগ্রাম বন্দর

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের সমন্বয়হীনতার সুযোগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জালিয়াতি করে আমদানি পণ্য পাচার হচ্ছে।  

কয়েক মাস ধরে বেশ কটি জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া চালান ধরা পড়েছে। মূলত বন্দর-কাস্টমসের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির সুযোগে কোটি কোটি টাকার চালান রাজস্ব পরিশোধ না করেই বন্দর থেকে আমদানিপণ্য বের হয়ে যাচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে বন্দর-কাস্টমস-সিঅ্যান্ডএফের একটি চক্র; আর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিপরীতে কাস্টমসের নয়; সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে দেশের প্রধান বন্দরের। 

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের উপপরিচালক মেজর রেজাউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের কেন্দ্রীয় অফিসেই কেবল কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে লগ ইন করার সুযোগ আছে। বন্দরের ১২টি গেটে সেই সিস্টেমে লগ ইনের সুযোগ নেই। বন্দর গেটগুলোর কিছুটা দূরে অবস্থিত কাস্টমসের অফিসে গিয়ে ডকুমেন্ট অনলাইনে চেক করতে হয় গেটে কর্মরত নিরাপত্তা সার্জেন্টদের। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ আমদানি চালান ছাড় দিতে হয় গেট দিয়ে; ফলে সিট থেকে উঠে গিয়ে বারবার এগুলো যাচাই করতে গেলে দীর্ঘ জট লেগে যায়।’

তিনি বলেন, ‘গত আগস্ট মাসে কাস্টমসের সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি করে পণ্য বের করার সময় বন্দর নিরাপত্তাকর্মীদের হাতে ধরা পড়ে বড় একটি চালান। এরপর আমরা কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি বুঝিয়েছি। আমরা জালিয়াতি করে পণ্য চালান ছাড় শতভাগ বন্ধ করতে কাস্টমসের সিস্টেমে লগ ইন করার অনুমতি চেয়েছি। তিনি (কাস্টমস কমিশনার) বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে আশ্বাসও দিয়েছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুফল মেলেনি। এরই মধ্যে বেশ কটি জালিয়াতির চালান ধরা পড়েছে।’

বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের মাঠ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দরের ১২টি গেটের প্রতিটির পাশেই রয়েছে কাস্টমসের গেট ডিভিশন; যেখানে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে লগ ইন করেন কাস্টমসের রাজস্ব বা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা। তারা কাস্টমসের রাজস্ব পরিশোধ, চালানটি বৈধ কি না নিশ্চিত হন। এরপর স্বাক্ষর করে রিলিজ অর্ডার দেন। সেই রিলিজ অর্ডারে ম্যানুয়ালি স্বাক্ষর যাচাই করে দেখে রেজিস্টার খাতায় নিবন্ধন করেন গেটে বন্দর নিরাপত্তারক্ষীরা। এরপর সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধির স্বাক্ষর নিয়ে পণ্য ছাড়ের ছাড়পত্র দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। এখানে নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই কেবল কাগজপত্র যাচাই করা হয়; বাড়তি কিছু করার কোনো সুযোগ নেই।

নিরাপত্তাকর্মীরা বলছেন, জালিয়াতচক্রের একজন যদি কাস্টমসের সব কাগজপত্র জাল করে সেই ফাইল বন্দর গেটের পাশে থাকা কাস্টমসকে এড়িয়ে সরাসরি গেটে চলে যান। এবং রিলিজ অর্ডার নিয়ে পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করে নেন; তা ধরার সুযোগ নিরাপত্তাকর্মীদের নেই। আগে থেকেই এই কাজটি করছে জালিয়াতচক্রটি; কিন্তু ধরা পড়ছে সম্প্রতি।

সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর বন্দর থেকে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে জালিয়াতির একটি চালান ধরা পড়ে। ঢাকার আমানুল্লাহ আয়রন ট্রেডার্স ৪৩ হাজার ৩০ কেজির চালানকে তিন হাজার তিন কেজি বানিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সরাসরি বন্দর গেটে চলে গিয়েছিল সিঅ্যান্ডএফ স্ট্যান্ডার্ড ফ্রেইট করপোরেশন। পরে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটক করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য না থাকলে চালানটি বন্দর থেকে বের হয়ে যেত। 

এর আগে, গত ৫ আগস্ট সাত কনটেইনার জিপসাম বোর্ড আমদানির ঘোষণা দিয়ে টাইলস আনে চট্টগ্রামের আমদানিকারক ‘ডাবল এ ট্রেড কমিউনিকেশন’। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আদিব ইন্টারন্যাশনালের চালানটির বিল অব এন্ট্রি চট্টগ্রাম কাস্টমসে জমা না দিয়ে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে বন্দরের মাসুল, কাস্টমসের শুল্ক পরিশোধ না করেই চালানটি খালাসের চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে দুটি ট্রাক বের হয়ে যায়, পরে গেটে বন্দরের এক নিরাপত্তাকর্মীর সন্দেহ হলে তৃতীয় ট্রাক বের হওয়ার সময় আটকে দেন। যাচাই করে দেখা যায়, গেট ডিভিশনে কাস্টমসে না গিয়েই সরাসরি বন্দর গেটে চলে এসেছে এই চালানটি। পরে সব চালান আটক করা হয়। এতে অন্তত সোয়া কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল।

কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগকে লগ ইন করতে দিলে সমস্যা কোথায় জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুণ্ড কালের কণ্ঠকে বলেন, পণ্য ছাড়ে জালিয়াতি শতভাগ ঠেকাতে এই সিস্টেমে অনুমতি চাইলে দিতে পারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আর বন্দরকে দিলে এই সিস্টেম লোড নেবে কি না সেটাও দেখতে হবে।

জালিয়াতি ঠেকাতে বন্দরকে নিজের কাজটা সঠিকভাবে করার তাগাদা দিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা সাধন কুমার বলেন, ‘বন্দরের ওয়ানস্টপ সার্ভিসে অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে লগ ইন করার অনুমতি আছে। সেখানে প্রথমেই বিল অব এন্ট্রি যাচাই করলে রাজস্ব পরিশোধ বা জালিয়াতি ধরা পড়ত। কিন্তু তারা সঠিকভাবে সেটি করেনি। আমরা একাধিক চালান তদন্ত করে এর প্রমাণ পেয়েছি। গাফিলতির কারণে সেই কর্মকর্তাকে সাসপেন্ডও করেছে বন্দর।’

তিনি বলেন, বন্দরের প্রতিটি গেটে কাস্টমসের রাজস্ব ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের গঠিত গেট ডিভিশনে কাস্টমস সিস্টেমে লগ ইন দেওয়া আছে। এখন কেউ যদি গেট ডিভিশন এড়িয়ে বন্দর গেটে চলে যান সে ক্ষেত্রে শেষ চেক পয়েন্ট হিসেবে নিরাপত্তারক্ষীদের লগ ইন দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে বন্দর কাস্টমসের সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমও বলছেন, ‘এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা লক্ষণীয়। দুটি প্রতিষ্ঠান একটু সচেতন হলেই এই জালিয়াতচক্রকে আটকানো ও চক্রের কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব। আমরা আশা করি, সমন্বয়হীনতার কারণে বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যেন প্রশ্ন না ওঠে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা