kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

হাতিরঝিলে দূষণ

দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ ওয়াটার বোটের যাত্রীরা

তানজিদ বসুনিয়া   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কর্মব্যস্ত নগরজীবনে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া পেতে কে না চায়! দিনে দিনে রাজধানীর জীবনধারায় কত কী যে পাল্টে যাচ্ছে। যেমন পাল্টে যাচ্ছে একটি প্রশস্ত এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর অনন্য সুযোগ। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথাও একটু খোলা জায়গায় একচিলতে কোমল বাতাসের স্পর্শ নেওয়ার বড় অভাব এই বিপুল মানুষের রাজধানীতে।

রাজধানীবাসীর এসব কথা মাথায় রেখে কয়েক বছর আগে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয় নান্দনিক স্থাপত্যের হাতিরঝিল। উদ্বোধনের পর থেকে এলাকাটি রাজধানীবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ঠাঁই করে নেয়। দিনে দিনে পথচারী আর দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকাটি। সবুজের বিস্তার আর ও স্বচ্ছ পানির সরবরাহে প্রাণ পায় হাতিরঝিল। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় কয়েক দিনের মধ্যেই হাতিরঝিলের সে জৌলুস হারিয়ে যেতে বসেছে।

হাতিরঝিলের সেই স্বচ্ছ পানি আর নেই। হয়ে উঠেছে কালচে ও বিষাক্ত পানির গারদ। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও ড্রেনেজবর্জ্যের মিশ্রণে ঝিলের পানি রূপ নিয়েছে বিষাক্ত পানিতে। আর এই পানির দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হাতিরঝিলে চলাচলকারী ও দর্শনার্থীরা। নগরবাসীর বিনোদনের জন্য ঝিলে রাখা হয়েছে ওয়াটার বোট। কিন্তু তীব্র দুর্গন্ধে বোটে ওঠা অসম্ভবপ্রায়। হাতিরঝিলের কিছু অংশের পানিতে দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ওই সব এলাকা দিয়ে চলাচল করতে হলে দর্শনার্থী ও ওয়াটার বোটের যাত্রীদের নাকে রুমাল চেপে ধরতে হয়।

রাজধানীর একটি বায়িং হাউসে কর্মরত মতিঝিলের বাসিন্দা আবু জাফর ব্যক্তিগত কাজে সপ্তাহে দুই দিন যাওয়া-আসা করেন ওয়াটার বোটে। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সপ্তাহে দুই দিন এই রুটে যাওয়া-আসা করি। কিন্তু এফডিসি থেকে উঠার সময় যখন ওয়াটার বোট ছাড়ে তখন দুর্গন্ধে টেকা দায়। বোটের পেছনের অংশে বসলে তো নিঃশ্বাস নেওয়াই বন্ধ হয়ে যায়।’

আবু জাফরের মতো প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার যাত্রী ওয়াটার বোটে করে রামপুরা, গুদারাঘাট ও এফডিসি মোড়ে যাওয়া-আসা করে। গুদারাঘাটে দুর্গন্ধ না থাকলেও অন্য দুই ঘাটে তীব্র দুর্গন্ধের কারণে ওয়াটার বোটে যাতায়াতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে যাত্রীরা। 

রামপুরাবাসী জেসমিন আরা বলেন, ‘আমার বাসা থেকে ওই রুট দিয়ে ছেলের স্কুলে যেতে ১৫ মিনিট সময় লাগে। তার পরও দুর্গন্ধের কারণে আমি বাচ্চাকে এদিক দিয়ে না নিয়ে রাস্তার জ্যাম ঠেলে ঘুরপথে স্কুলে যাই। এত সুন্দর একটা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, কত মানুষের উপকারে আসছে; কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এই দুর্ভোগ। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত যেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মধুবাগ, রামপুরা, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার ও কাঁঠালবাগান এলাকার পানির ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইন একসঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এ কারণে এসব এলাকার শিল্পবর্জ্য, বাসাবাড়ির ময়লা পানি, সব ধরনের পচা-বাসি আবর্জনা এসে পড়ছে হাতিরঝিলে। বৃষ্টির মৌসুমে তিন মাস হাতিরঝিলের (মুধবাগ থেকে এফডিসি পর্যন্ত) পানিতে দুর্গন্ধের মাত্রা সীমানা ছাড়ায়। শীত আসি আসি করছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাতিরঝিলের এফডিসি মোড় অংশ থেকে লেকের মধুবাগ সেতু পর্যন্ত পানির রং তীব্র কালচে। ওই কালচে পানির দুর্গন্ধে টেকা দায়। ঝিলের পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে চানাচুর ও চিপসের প্যাকেট, পলিথিন, পানির বোতল, ওয়ান টাইম গ্লাসসহ আশপাশের বাসাবাড়ির গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা। হাতিরঝিলের চারপাশে গড়ে উঠা দোকান ও রেস্তোরাঁর ময়লাও ফেলা হচ্ছে ঝিলের পানিতে। কয়েকটি ড্রেন দিয়ে আশপাশের এলাকার ময়লা-আবর্জনা ঝিলে প্রবেশ করে নষ্ট করছে পানির স্বচ্ছতা। দীর্ঘদিন ঝিলে এই পানি আটকে থাকায় ক্রমে পানির রং কালো হয়ে বাড়ছে দুর্গন্ধ। সেই উৎকট দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে ঝিলপার ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে এফডিসি মোড় ও রামপুরা অংশে। এ ছাড়া ঝিলের উত্তর পার দিয়ে মগবাজার থেকে গুলশান-বাড্ডা যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে অন্যান্য অংশের পানি কালচে ও দূষিত হলেও গুদারাঘাট  ও নিকেতন অংশের পানি কিছুটা স্বচ্ছ।

হাতিরঝিলে ওয়াটার বোটের পরিচালনায় থাকা করিম গ্রুপের ইনচার্জ তালিম হোসেন বলেন, ‘দুর্গন্ধের কথা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। গুদারাঘাট এলাকার পানি অপেক্ষাকৃত ভালো হলেও অন্য অংশের পানি খুবই নোংরা।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো হাতিরঝিলের অধিকাংশ জায়গাই খেয়ে ফেলেছে রাস্তা। পথচারীদের জন্য ওয়াকিং রুট করেনি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট ও অন্যান্য বর্জ্য গিয়ে লেকের জলে পড়ে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অথচ এখানে হাওর অথবা বিলের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করে  মৎস্য চাষ যেমন করতে পারত, তেমনি লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশও ঠিক রাখতে পারত। তাহলে এখনকার মতো এ রকম ইকোলজিক্যাল ইমব্যালান্স দেখতে হতো না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা