kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চুনারুঘাটের সীমান্ত এখন চোরাচালানের অভয়ারণ্য

বানের পানির মতো আসছে মাদক, চা পাতা, টায়ারসহ বিভিন্ন পণ্য

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ ও ভারতের আন্ত সীমান্ত চোরাচালানের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা ও গুইবিল সীমান্তবর্তী এলাকা। কিছুদিন আগেও যেখানে মাথায় বস্তা নিয়ে রাতের আঁধারে লুকিয়ে-চাপিয়ে চোরাচালানের পণ্য বহন করত চোরাকারবারিরা, সেই তারাই এখন দিনে-দুপুরে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে করে সীমান্তে পণ্য আনা-নেওয়া করে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মালামাল আসা-যাওয়া করে এ সীমান্ত দিয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রীতিমতো বানের পানির মতো এ সীমান্ত দিয়ে আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক; মদ ও বিয়ার; নিম্নমানের চা পাতা, গাড়ির টায়ার, গরম মসলাসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য। আসছে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় গরুও। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে আমদানি করা চীনা রসুন, বুট, ছোলা, ডাল ও ইলিশ মাছ। সূত্রগুলো জানায়, চুনারুঘাট উপজেলার গরু বাজারগুলোর গড় ইজারার পরিমাণ যেখানে চার-পাঁচ লাখ টাকা, সেখানে ভারতীয় গরু আসার কারণে সীমান্ত একটি ইউনিয়নের এক বাজারের ইজারাই ৪৫ লাখ টাকা। যেখানে ভারতীয় চা পাতা আসতে কেউ শোনেনি, সেখানে এখন প্রতি মাসেই অন্তত ১০ হাজার টাকা চা পাতা এ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসছে।

চুনারুঘাট সীমান্ত দিয়ে ব্যাপাক হারে চোরাচালান বেড়ে যাওয়া নিয়ে এলাকায় চাপা ক্ষোভ রয়েছে মানুষের মধ্যে। কিন্তু চোরাচালানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য অনেক জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারাসহ প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

সর্বশেষ গত শনিবার রাত ১০টায় উপজেলার গুইবিল সীমান্ত এলাকার মানিক ভাণ্ডার গ্রাম থেকে চীন থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা রসুনের একটি চালান ভারতে পাচারকালে আটক করে বিজিবি। ২৪ বস্তায় আটককৃত মালের পরিমাণ চার টন। আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে চুনারুঘাট উপজেলার কোটবাড়ী গোদারাঘাট এলাকা থেকে ভারত থেকে নিয়ে আসা চা পাতা ও ৪৯টি টায়ার জব্দ করে বিজিবি। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই দুই বড় চালান জব্দ করা নিয়ে হবিগঞ্জের সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, উপজেলার গুইবিল সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন আমীর আলী, বাবলু মিয়া, আলমগীর মিয়া, রায়েল মিয়া এবং বাল্লা সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন মণ্ডল, আশিক, উত্তম, কালাম ও রহিম। ভারত থেকে আনার পর প্রতিটি গরুর বিপরীতে বিভিন্ন সংস্থাকে দেড় হাজার টাকা কমিশন দেওয়া হয়। এর ভাগ পান সরকারি দলের অনেক পাতি নেতাও। আর চা পাতার জন্য প্রতি বস্তায় দিতে হয় ৫০০ টাকা। প্রভাবশালী কেউ যথাযথ ভাগ না পেলে প্রায়ই বাগিবতণ্ডার ঘটনাও ঘটে।

বাল্লা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্বাধীনতার পর এভাবে কোনো সময় চুনারুঘাট সীমান্তে চোরাচালানের ঘটনা ঘটেনি। একসময় ছিঁচকে চোরাকারবারিরা মাথায় করে সামান্য মালা আনা-নেওয়া করলেও এখন বড় বড় গাড়ি ব্যবহার করা হয় চোরাচালানে। প্রশাসন নজর দিলে এভাবে চোরাচালান সম্ভব হতো না।

তিনি আরো জানান, চুনারুঘাট উপজেলার আমুরোড বাজারে ভারত থেকে নিয়ে আসা গরু বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে গরু নিয়ে যায়। এটি একটি ইউনিয়নের বাজার হলেও শুধু চোরাই গরুর জন্য এই বাজারের ইজারামূল্য ৫১ লাখ টাকা, যেখানে উপজেলার অন্যান্য বাজারের ইজারার গড় মূল্য ছয় লাখ টাকা।

এদিকে ভারত থেকে চোরাই পথে নিয়ে আসা নিম্নমানের চা পাতার জন্য হুমকিতে রয়েছে দেশের উৎপাদিত চা। আবার চীন থেকে আমদানি করা রসুন ভারতে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে এই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, চুনারুঘাটের বাল্লা থেকে সাতছড়ি পর্যন্ত সীমান্ত চা বাগান এবং পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ার কারণেই পাচারকাজ সহজ হয়ে যায়। উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন ২ নম্বর আহমদাবাদ, ১ নম্বর গাজীপুর ও ৩ নম্বর দেওরগাছ ইউনিয়নের কতিপয় ‘ওপর মহলের’ আশীর্বাদপুষ্ট নেতা এসব চোরাচালান সিন্ডিকেটের হোতা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার সাদ্দামবাজার, গনকিরপাড়, ইকরতলী, গোছাপাড়া, ঘনম্যামপুর, কালিশিরি, দেওরগাছ ইউনিয়নের আমতলীসহ বিভিন্ন গ্রামে জমা হয় ভারতীয় চা পাতা। এসব গ্রাম থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতারা চা পাতা কিনে নেয়। জানা গেছে, টিমটিবিল সীমান্তের টেংরাবাড়ী ও গুইবিল সীমান্তের প্রহড়মোড়া স্থান দিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার কেজি চা পাতা দেশে প্রবেশ করে, যা পরে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।

চা পাতা চালানের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে চিমিটিবিল-আমু চা বাগান সড়ক, আমু চা বাগান-কালিশিরি সড়ক, চিমটিবিল-চণ্ডিছড়া বাগান সড়ক এবং আমু চা বাগান-আমুরোড বাজার সড়ককে ব্যবহার করা হয়।

এ ব্যাপারে ডানকান ব্রাদার্স লিমিটেডের মালিকানাধীন চান্দপুর চা বাগানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারত থেকে চোরাই পথে যে চা পাতা আসে, তা নিম্নমানের। এসব পাতা আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে আমাদের দেশীয় চা পাতার দাম পড়ে যাচ্ছে।’

আহমদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবেদ হাসনাত চৌধুরী সঞ্জু বলেন, ‘এখান দিয়ে সব সময়ই চোরাচালান হয়ে আসছে। প্রশাসনের সঙ্গে আমরাও চেষ্টা করি অবৈধ মালামাল আটকাতে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় চোরাকারবারিদের দমানো যাচ্ছে না।’

এ ব্যাপারে বিজিবি ৫৫ ব্যাটালিয়নের বাল্লা সীমান্ত ফাঁড়ির প্রধান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সব ধরনের চোরাচালান রোধে সীমান্তে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মালামালও জব্দ করা হয়। এ ব্যাপারে আমরা বিএসএফের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আরো বেশি জনবল থাকলে চোরাচালান রোধ করা সহজ হতো।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা